নাহিদা আশরাফীর গল্প

পার্সেল

জাগতিক জটিলতা সেরে ঘরে ফিরতে ফিরতে প্রায় সন্ধে ছুঁই ছুঁই। আর ফেরা মানেই তো মুক্তি নয়। দায়দেনার ফিরিস্তি, কর্ম আর কর্তব্যের চুলচেরা হিসেব। সব বুঝিয়ে দিয়ে তবেই না একটু খোলা বারান্দার দেখা মেলে, যেখানে দখিন হাওয়া তার অপেক্ষায়। অথচ ঘর পেরিয়ে এই বারান্দাটুকুতে পৌঁছুতে প্রতিদিনই তহমিনা বানুর সেই মধ্যযামিনী। আর ওই সময়টুকুতেই তার যত নিজস্বপনা। সকালে অফিসে বেরুবার মুখে কুরিয়ার বয়ের দিয়ে যাওয়া পার্সেলটি নিয়ে বসবার এখনই উপযুক্ত সময়।
‘আপনিই কি তনু। তৃতীয়তলা পূর্বপাশে থাকেন?’

কুরিয়ার বয়ের এহেন প্রশ্নের কী জবাব দিয়েছিল তহমিনা, এখন মনে করতে পারছে না। কী করে পারবে? কম করে হলেও পঁয়ত্রিশ বছর। হ্যাঁ পঁয়ত্রিশ তো হবেই, বেশিও হতে পারে এই নামে কেউ তাকে ডাকেনি। অথচ এতগুলো বছর পর সেই নামটিই গোটা গোটা হরফে পার্সেলের গায়ে দেখে নিজেকে স্থির রাখা কঠিন হয়ে যায়। তার হাত কাঁপছিল, সমস্ত শরীরজুড়ে এক অদ্ভুত শিহরণ। কিন্তু শারীরিক বয়সের একটা পর্যায়ে এসে হৃদয়ের প্রগলভতার প্রকাশ ঠিক শোভন নয়। তাই কোনো রকমে পার্সেলটি দরজায় দাঁড়ানো কাজের মেয়ের হাতে দিয়ে তার রুমের কেবিনেটে রেখে দেবার কথা বলেই অফিসমুখী হলেন।

অফিসের পুরো সময়টা এক অদ্ভুত উচাটনে ভুগেছেন তহমিনা বানু। পার্সেলটা মেয়েটা ঠিকমতো রেখেছে তো? একবার টেলিফোনে খোঁজ নিলে হয়। টেলিফোনটা কয়েকবার হাতে নিয়েও আবার রেখে দেন। কত শত গুরুত্বপূর্ণ পারিবারিক কাজ অফিসে এসে অবলীলায় ভুলে গেছেন। ছেলেমেয়েরাও এ জন্যে তাকে কত অনুযোগ করেছে। অথচ আজ সামান্য পার্সেলটার জন্যে মাকে ফোন করতে দেখলে কী ভাববে ওরা? এত কিছু ভেবে আর ফোন করা হয়ে ওঠে না। অথচ ইচ্ছে হচ্ছে বাসায় গিয়ে পার্সেলটা দেখে আসে এখনি। বাকিটা সময় তাহলে অফিসে মনোযোগ দিতে পারত।

আদৌ কি পারত, কে জানে? চশমার গ্লাসটা দিন দিন ভারী হচ্ছে। সামনে থাকা অনেক কিছুই আজকাল চশমা ছাড়া ভালো দেখতে পান না। কিন্তু কি আশ্চর্যরকমভাবে পঁয়ত্রিশ বছর আগের ঘটনা কত স্পষ্টই না দেখতে পাচ্ছেন মনের চোখে ।

কার্জন হল…ডিপার্টমেন্টে প্রথম পরিচয়েই একে অপরের প্রতি এক অজানা অনুভূতি, একটু একটু করে কাছে আসা, সময়ের পরিক্রমায় নিজেদের পরিপূরক হিসেবে উত্তীর্ণ করানো, অভিমান, খুনসুটি, উত্তাল সব প্রেমময় দিন। ঠিক যেন ট্রেনের জানালায় বসে সতেজ সবুজ দৃশ্যপট একে একে দেখে যাওয়া। কোনো কিছুই ভোলেননি তহমিনা বানু।
‘তোমার নামটা বড্ড লম্বা। ভাবছি কাটছাঁট করে মনমতো করে নেব।‘নিখিলের এ কথায় শুধু মৃদু হেসেছিল তহমিনা।
‘হ্যা, পেয়েছি। তনু, আজ থেকে তনুই ডাকব তোমায়।’

সেই থেকে নিখিল থাকা অবধি সে তনু হয়েই ছিল। নিখিল তার জীবন থেকে চলে যাবার পর সেই তনু যে আবার তহমিনা বানু হয়েছে, আজ অবধি সেই ভূমিকাতেই যোগ্যতার সাথে কর্তব্য পালন করে আসছে। আজ সকালে আসা পার্সেলটা এক নিমিষেই তাকে আবার তহমিনা থেকে তনুতে ফিরিয়ে নিল।

নাহ আর অফিসে বসে থাকার কোনো মানে হয় না। বেশ আগেই উঠে পড়েন তিনি। রাস্তার জ্যাম রোজকার চেয়ে দীর্ঘ মনে হয়। ঘরে ফিরতেই ছেলেমেয়ের অবাক করা প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়।
‘এত তাড়াতাড়ি অফিস থেকে তুমি? কোনো সমস্যা নেই তো? শরীর ঠিক আছে তো মা?’

হাজারো প্রশ্নের দায় এড়ানো সত্যিই কঠিন। তবু দায়সারা গোছের একটা উত্তর দিয়ে ছেলেমেয়ের সামনে থেকে সরে গিয়ে হাঁপ ছেড়ে বাঁচেন তহমিনা। সারাদিনের অস্থিরতা, টানাপোড়েন, অপেক্ষার তীব্রতা হয়তো তার চেহারায় ছাপ ফেলেছিল। ছেলেমেয়ে সেটাকে ক্লান্তি আর অসুস্থতা ভেবে বেশি ঘাঁটায়নি। সেও বেঁচে গেছে। তবু সংসারে নিয়ম নামের কিছু অনিয়ম থাকে। তার দায় এড়ানো মুশকিল। তাই সব নিয়ম অনিয়মের নিয়মতান্ত্রিক পরিচালনা শেষে তহমিনা ফেরেন তার নিজ ভুবনে।

সমস্ত মনোযোগ কেড়ে নেয়া প্যাকেটটি নিয়ে এখন বসবে তহমিনা। ধীর পায়ে কেবিনেটের কাছে এসে দাঁড়াতেই সে যেন সেই আগের তনু হয়ে যান। বুকের ধুকপুক শব্দটা ঘড়ির টিক টিক শব্দকেও হার মানাচ্ছিল। কাঁপা কাঁপা হাতে কেবিনেট খুলে এ তাক ও তাক খোঁজেন। কোথায় গেল প্যাকেটটি? পাশে লেখার টেবিল, ওয়ার্ডরোব সব পাগলের মতো তন্নতন্ন করেও খুঁজে না পেয়ে অবশেষে বাধ্য হয়ে সেজ মেয়েকে ডাকলেন।
‘সকালে একটা পার্সেল দিয়েছিলাম রোজির হাতে। কোথায় রেখেছে বলতে পারবে?’

‘মা তুমি না সত্যি বুড়িয়ে যাচ্ছ। পার্সেলটি পাশের ফ্ল্যাটের করিম চাচার ছেলের বৌ তনুর। অবশ্য দোষ পুরোটা তোমারও নয়। পার্সেলে তৃতীয়তলা পশ্চিম লিখতে গিয়ে প্রেরক ভুলবশত তৃতীয়তলা পূর্ব লিখে রেখেছিল। আর তাতেই যত বিড়ম্বনা। তুমি পূর্ব দেখেই পার্সেলটা নিয়ে এসেছ। উপরের নামটা দেখবে না?’

কি বলবেন তহমিনা বানু। পূর্ব-পশ্চিম নয় মূলত নামটা দেখেই তো পার্সেলটা নিয়েছিল সে-এ কথা মেয়েকে কী বলা যায়? স্থবির তহমিনা বানু ভাবেন, একটা ভুল এত বছর পরে নিখিলকে কেমন করে আবার ফিরিয়ে নিয়ে এলো তার জীবনে। ভেবেই নিয়েছিলেন তার সব আবেগ আর অনুভূতিকে সে নিজ হাতে গলা টিপে মেরে ফেলতে পেরেছেন। একটা ছোট্ট পার্সেল তাকে চোখে আঙুল দিয়ে বুঝিয়ে দিয়ে গেল বয়স শরীরে দানা বেঁধেছে বটে কিন্তু তার অপেক্ষা আজও তনুতেই স্থির হয়ে আছে।


লেখক পরিচিতি
নাহিদা আশরাফী। লেখক, সম্পাদক, ও প্রকাশক। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। ফেঞ্চ ভাষায় ডিপ্লোমা করেন আলিয়েস ফ্রসেজ থেকে। দীর্ঘদিন জড়িত ছিলেন শিক্ষকতা পেশায়। বর্তমানে কবিতাক্যাফে ও প্রকাশনা সংস্থা জলধির সত্ত্বাধিকারী ।

প্রকাশিত বই
গল্প:
১. মায়াবৃক্ষ (একাত্তর প্রকাশনী, ২০১৬)।
২. জাদুর ট্রাঙ্ক ও বিবর্ণ বিষাদেরা (জলধি, ২০২১)।
৩. ঝুলবারান্দা তিনটি মাছ আর একটি বিন্দুবর্তী জলাশয় (২০২২)।

কবিতা:
১. শুক্লা দ্বাদশী (বাংলাদেশ রাইটার্স ক্লাব, ২০১৪)।
২. দীপাঞ্জলি (জাগৃতি, ২০১৫)।
৩. এপিটাফ (কুঁড়েঘর, ২০১৫)।
৪. প্রেম নিয়ে পাখিরা যা ভাবে (পরিবার পাবলিকেশন্স, ২০১৮)।
৫. Tenets of sadness (Bilingual book of poetry) (পরানকথা, ২০২০)।
৬. ফিরতে চাই বৃক্ষজন্মের কাছে (বিদ্যাপ্রকাশ বাংলাদেশ ও কবিতা আশ্রম কলকাতা, ২০২৩)।

সম্পাদিত গ্রন্থ:
১. মুক্তির গল্পে ওরা এগারোজন (মুক্তিযুদ্ধের গল্প সংকলন)।
(পরিবার পাবলিকেশন্স, ২০১৭)।
২. বিজয় পুরাণ (বিজয়ের গল্পসংকলন, বাংলাপ্রকাশ, ২০২০)।
৩. রুদ্ধ দিনের গল্প (অতিমারীর গল্প সংকলন, ২০২১ জলধি)।
৪. যুগল জোনাকি (আবৃত্তি উপযোগী দ্বৈত কবিতা সংকলন)।

সম্পাদিত ছোটকাগজ: জলধি (সাহিত্যের কাগজ)।

Exit mobile version