এক্সক্লুসিভবাংলাদেশবিনোদনরাজধানী

দেশীয় সংস্কৃতি ও নান্দনিকতার মিশেলে হানিফ সংকেতের ছেলের বিয়ে

শুধু অঢেল অর্থ আর ক্ষমতা থাকলেই কোনো অনুষ্ঠান সফল হয় না, প্রয়োজন একটি নান্দনিক মন, দেশ প্রেম এবং দেশীয় সংস্কৃতির প্রতি মমত্ববোধ। গত ২৩ মার্চ সেনাকুঞ্জে অনুষ্ঠিত দেশবরেণ্য উপস্থাপক ও মিডিয়া ব্যক্তিত্ব হানিফ সংকেতের একমাত্র পুত্র ফাগুনের বিয়েতে আগত বিশিষ্টজনদের মন্তব্যে সেটাই প্রকাশ পেয়েছে।

বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকের সম্পাদক, টিভি চ্যানেলের মালিক, টেলিভিশনের বিভিন্ন সংগঠনের নেতৃবৃন্দ থেকে শুরু করে অভিনয়, সংগীত, উপস্থাপক, মডেল, পরিচালক, প্রযোজক, লেখক, সাংবাদিক প্রত্যেকটি অঙ্গণের তারকাদের উপস্থিতি ছিলো লক্ষ্যণীয়। ফলে বিয়ের অনুষ্ঠান পরিণত হয়েছিলো যেন তারকা ও সুধীজনের মিলনমেলায়। দেখে মনে হয়েছে এটি যেন সবার পারিবারিক অনুষ্ঠান।

এদের মধ্যে অনেকেই এর আগে একাধিকবার সেনাকুঞ্জে বিয়ের অনুষ্ঠানে গেছেন কিন্তু সেদিন যেন সেনাকুঞ্জ সেজেছিলো ভিন্নসাজে। অসাধারণ সেই দৃশ্যসজ্জা। যা ইতোপূর্বে এভাবে কেউ দেখেননি। অর্থের প্রদর্শণী ছিলো না, ছিলো রুচির বহিঃপ্রকাশ।

দেশীয় সংস্কৃতির প্রতি ভালোবাসা। দেশ-বিদেশের তথাকথিত তারকাদের কোনো উদ্দাম নৃত্য নয়, ছিলো দেশীয় বাদ্যযন্ত্রে দেশের সুর, মাটির সুর। ২৩ মার্চ সেনাকুঞ্জে অনুষ্ঠিত ফাগুনের এই বিয়েতে যেমন সমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের স্বতস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ছিলো, তেমনি বসেছিলো তারকাদের মিলনমেলা। 

মুহুর্মুহু ক্যামেরা ক্লিক আর মোবাইলের সেলফিতেই যেন ব্যস্ত ছিলেন সবাই। সবার সঙ্গে ছবি তুলতে গিয়ে বর ফাগুন আর কনে রাওনাককে ক্লান্ত-অবসন্ন মনে হলেও মুখে ছিলো হাসি। শুধু বর-কনেই নয়, বাবা হানিফ সংকেত, মা সানজিদা হানিফ এবং তাদের কন্যা সিনদিদা হানিফ বর্ণনা এতো ভিড়ের মধ্যেও হাসিমুখে অতিথিদের অর্ভ্যথনা এবং আপ্যায়ণ করছিলেন।

সেনাকুঞ্জের অনুষ্ঠানস্থলে ঢোকার পথেই ছিলো কয়েক ধাপের মোগল আমলের ঐতিহ্যবাহী তোড়ন। হলের ভেতরেই তৈরি করা হয়েছে মোগল ঐতিহ্যের আলোকে যেন এক স্বর্ণালী রাজপ্রাসাদ। সেখানে বসেছিলো যেন এক রাজপুত্র ও রাজকন্যা- বর-কনে বেশী ফাগুন ও রাওনাক। শুধু মঞ্চ সজ্জাই নয়, কনের পোশাকেও ছিলো মোগল ঐতিহ্যের ছাপ।

ইত্যাদির মতোই সুপরিকল্পিত ও ছন্দময় ছিলো পুরো অনুষ্ঠান। হানিফ সংকেতের ঘনিষ্ঠ বন্ধু কুমার বিশ্বজিৎকেও পরিবারের সদস্যদের মতো অতিথি অভ্যর্থনায় বন্ধুকে সহযোগিতায় বেশ তৎপর দেখা গিয়েছে।

অনেক তারকার ভিড়ে দু’জন অতিথির উপস্থিতি অনেকেরই দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। অনেককেই করেছে আবেগাপ্লুত। তারা হলেন শিল্পী এন্ড্রু কিশোরের পরিবার এবং সুরকার আলী আকবর রুপুর পরিবার। বন্ধুরা না থাকলেও হানিফ সংকেত তার বন্ধুদের পরিবারকে ভোলেননি। 

হলের বাইরে ডানে ছিলো দেশীয় বাদ্যযন্ত্রের এক অসাধারণ সংগ্রহ এবং পরিবেশনা। আজকালকার বিয়ের অনুষ্ঠানে যা কখনই চোখে পড়ে না। একতারা, দোতারা, কর্নেট, সানাই, খমক, বেহালা, বাঁশি, হারমোনিয়ামসহ প্রায় ১৫টি দেশিয় বাদ্যযন্ত্র বাজাচ্ছিলেন দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা যন্ত্রশিল্পীরা।

আর সংগীত তারকা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ‘যদি থাকে নসিবে…’ খ্যাত বাউল শিল্পী চিশতি বাউল। সেনাকুঞ্জে ঢোকার মুখে এইসব দেশীয় বাদ্যযন্ত্র আগত অতিথিদের যেমন চমকে দিয়েছে, তেমনি দেশীয় সংগীতের বাদন আমাদের বিয়ের অনুষ্ঠানের পুরানো ঐতিহ্যকেই মনে করিয়ে দিয়েছে।

জানা গেছে গত ২২ মার্চ ঢাকার অদূরে হেমায়েতপুরে তার নিজস্ব শুটিং স্পট ফাগুন নিকেতনে আয়োজন করেছিলেন হলদে গ্রামীণ মেলা। যেখানে অনুষ্ঠিত হয়েছিলো হলুদ অনুষ্ঠান। বিশাল মাঠজুড়ে আয়োজিত সেই হলদে মেলাটিও ছিলো আকর্ষণীয় এবং ব্যতিক্রমী।

দেশের মিডিয়া জগতে ফাগুন অডিও ভিশন একটি প্রাচীন ও নন্দিত নাম। আর এই প্রতিষ্ঠানটির নামকরণ করা হয়েছে হানিফ সংকেতের পুত্র ফাগুনের নামে। ফাগুনের এই বিয়েটি নানা কারণে আলোচিত, প্রশংসিত এবং অনুকরণীয়।

কারণ শুধু বিয়ের অনুষ্ঠানই নয়, বিয়ের আমন্ত্রণপত্রটি যারা পেয়েছেন তারা এর শিল্পরূপ দেখে ভূয়সী প্রংশসা করেছেন। বিয়ের আমন্ত্রণ পত্রের খাম খুললেই বেরিয়ে আসে আমাদের গ্রামীণ ঐতিহ্য নকশীকাঁথার চিত্র। যেখানে রয়েছে গ্রামীণ পথে পালকি যাত্রার ছবি।

জানা যায়, প্রায় দেড়শো নকশি শিল্পী তাদের হাতের নিপুন ছোঁয়ায় সুঁচের ফোঁড়ে ফুঁটিয়ে তুলেছেন গ্রামীণ পথে বর-কণের এই পালকি যাত্রার প্রতিকি চিত্র। কার্ডের উপরে লেখা রয়েছে ফাগুনের বৌভাত। আর ভেতরে কার্ডের চারিদিকে জামদানীর পাড়ের মাঝখানে আমন্ত্রণ বাণী। অপূর্ব দেশিয় শিল্পের সমন্বয়ে এক অসাধারণ আমন্ত্রণপত্র।

হানিফ সংকেতের অনুষ্ঠানে যেমন চমক থাকে, থাকে দেশীয় সংস্কৃতির কথা, দেশের মাটির কথা, তেমনি তার নিজের পারিবারিক অনুষ্ঠানেও তার প্রতিফলন দেখা গেছে। এখানেই তার স্বকীয়তা ও কথা-কাজের মিল।

উল্লেখ্য হানিফ সংকেতের নিজস্ব কোন ফেসবুক নেই, আছে ফ্যান পেজ। যেখানে আজ পর্যন্ত কখনওই তিনি কোন পারিবারিক ছবি যেমন দেননি তেমনি অনুষ্ঠান ছাড়া কোন ব্যক্তিগত ছবিও পোস্ট করেননি।তাছাড়া পত্র-পত্রিকায় কিংবা টিভিতে কখনও তার পারিবারিক ছবি বা পরিবার সম্পর্কে বিস্তারিত কোন সংবাদও দেখা যায়নি। কারণ এসব ব্যাপারে তিনি এবং তার পরিবার বরাবরই প্রচার বিমুখ।

তবে এই বিয়ের অনুষ্ঠানের সুবাদে তার পারিবারিক কিছু চিত্র প্রথমবারের মতো আমন্ত্রিত অতিথি ও তারকাদের মাধ্যমে তাদের নিজ নিজ ফেসবুকে প্রকাশিত হয়েছে। আর সেখান থেকেই ভেসে চলছে ফেসবুকের পাতায় পাতায়। দর্শকরা দেখছেন, প্রশংসা করছেন আর দোয়া করছেন বর-কনের সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য।

Back to top button