বিশ্ব সংবাদ

পাকিস্তানে সিংহাসনবাজী খেলায় কাকে সমর্থন দেবে সেনাবাহিনী?

পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচনের ফলাফল ছিল বিস্ময়কর। বেশিরভাগ বিশ্লেষক ও পর্যবেক্ষক তিনবারের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের দলের সহজ জয়ের প্রত্যাশা করছিলেন। এমনটি মনে করার পেছনে যুক্তি ছিল, দেশটির প্রভাবশালী সেনাবাহিনীর সমর্থন ছিল তার পক্ষে। দেশটিতে জনপ্রিয় আরেক রাজনীতিক ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান দুর্নীতি ও বেআইনি বিয়ের অভিযোগে কারাবন্দি ছিলেন। তিনি ও তার দলকে নির্বাচনে অংশ নিতে দেওয়া হয়নি। এরপরও ভোটে সবচেয়ে আসনে জয়ী হয়েছে ইমরান সমর্থিত স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। নওয়াজের দলকে সরকার গঠনে জোট গঠনে দৌড়ঝাঁপ করতে হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভোটের ফল ইঙ্গিত দিচ্ছে, যে সরকার গঠিত হবে, তা হবে দুর্বল। যা দেশটির ক্ষমতার নেপথ্যে থাকা সামরিক কাঠামোর জন্য সুবিধাজনক হবে। তারা সতর্ক করে বলছেন, পাকিস্তান হয়তো রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার একটি দীর্ঘ সময়ে প্রবেশের মুখে রয়েছে।

পাকিস্তানে সরকার গঠনের জন্য সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রীকে ৩৬৬ আসনের জাতীয় পরিষদে ১৬৯ জনের সমর্থন প্রয়োজন। এর মধ্যে ৭০টি আসন সংরক্ষিত, ৬০টি নারীদের এবং ১০টি অমুসলিমদের জন্য। দলগুলোর ভোটে জয়লাভ করা আসন অনুপাতে সংরক্ষিত আসনগুলো বণ্টন করা হয়। পাকিস্তানের আইন অনুসারে, স্বতন্ত্র প্রার্থীরা পার্লামেন্টের কোনও সংরক্ষিত আসন পাবেন না।

এবারের নির্বাচনে ৫৪টি আসন পেয়েছে বিলাওয়াল ভুট্টো জারদারির পাকিস্তান পিপলস পার্টি (পিপিপি)। দলটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ইমরান খানের পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) বা নওয়াজ শরিফের পাকিস্তান মুসলিম লিগ-নওয়াজ (পিএমএল-এন) কারও সঙ্গে সরকার গঠন নিয়ে তাদের আনুষ্ঠানিক আলোচনা হয়নি। তবে বিলাওয়ালের বাবা নিশ্চিত করেছেন যে নওয়াজের ভাই শাহবাজ শরিফের সঙ্গে লাহোরে একটি অনানুষ্ঠানিক বৈঠক হয়েছে।

করাচিভিত্তিক মুত্তাহিদা কওমি মুভমেন্ট-পাকিস্তান (এমকিউএম-পি) এবার ১৭ আসনে জয়ী হয়ে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। দলটিও যেকোনও জোট সরকার গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।

চ্যাথাম হাউজ থিংক ট্যাংকের ড. ফারজানা শেখ বলেছেন, ইমরান সমর্থিত স্বতন্ত্রদের সরকার গঠনের সম্ভাবনা কম এবং অনেক মানুষ আশঙ্কা করছেন, পিএমএল-এন ও পিপিপির জোট হবে দুর্বল এবং অস্থিতিশীল জোট।

ফলাফলে ইমরান খানের পিটিআই সমর্থিতরা বেশিরভাগ আসনে জয়ী হলেও এখনও স্পষ্ট হয়নি পাকিস্তানের পরবর্তী সরকার কারা গঠন করবে। যা একটি রাজনৈতিক বিশৃঙ্খল পরিবেশের জন্ম দিচ্ছে।

পিটিআই চেয়ারম্যান গহর আলী খান সরকার গঠনে দলের লক্ষ্যের কথা জোর দিয়ে বলেছেন। যদিও তাদের সামনে অনেক বাধা রয়েছে। বেশিরভাগ আসন জিতলেও সরকার গঠনের জন্য পর্যাপ্ত সংখ্যাগরিষ্ঠতা দলটি পায়নি। তিনি বলেছেন, ফলাফল স্পষ্ট আমরা সংখ্যাগরিষ্ঠ দল এবং আমরাই সরকার গঠন করতে যাচ্ছি। জনগণ রায় দিয়েছেন, তারা আমাদের সরকার গঠনের দায়িত্ব দিয়েছেন। তারা রাস্তায় নেমে আসার আগে এই ম্যান্ডেটের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো উচিত। জনগণ কথা বলেছেন, তারা চান পাকিস্তান হবে মুক্ত ও গণতান্ত্রিক।

পিটিআইয়ের সরকার গঠনের উদ্যোগকে গহর খান ‘সময়ের সঙ্গে পাল্লা’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এমন সময় তিনি এই মন্তব্য করলেন, যখন পাকিস্তানের তথাকথিত ‘গেম অব থ্রোনস’ শুরু হয়েছে। শুক্রবার রাতেই অনানুষ্ঠানিক বৈঠক করেছে পিএমএলএন ও পিপিপি। পরে শনিবার অপর ছোট দলগুলোর সঙ্গেও বৈঠক হয়েছে তাদের। এসব বৈঠকের লক্ষ্য ছিল পিটিআইকে ক্ষমতা থেকে বাইরে রাখতে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করা।

সেনাবাহিনীর সঙ্গে ইমরান খানের সমঝোতার বিষয়টিও একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। ফল প্রকাশের পর নির্বাচনে সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের জনগণের অবস্থান সেনাপ্রধান জেনারেল সৈয়দ আসিম মুনিরের ওপর নিশ্চিতভাবে চাপ তৈরি করবে।

সেনাপ্রধানকে এখন অবশ্যই সিদ্ধান্ত নিতে হবে ইমরানের সঙ্গে বিরোধ মিটিয়ে ফেলা বা দ্বিধা ছাড়া এগিয়ে যাওয়া এবং খানবিরোধী রাজনীতিকদের একটি জোট গঠন করা। বিশ্লেষকরা মনে করেন, এমন জোট সরকার হবে দুর্বল এবং টেকসই হবে না।

শনিবার এক বিবৃতিতে জেনারেল মুনির ঐক্য ও স্বাভাবিকতার ডাক দিয়েছেন। অনেকে তার এই বক্তব্যকে ইমরান খানের সঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুতির ইঙ্গিত হিসেবে ধরে নিচ্ছেন।

শনিবার ইমরানকে বেশ কয়েকটি মামলায় জামিন দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে একটি মামলা রয়েছে সেনাবাহিনীর স্থাপনায় তার সমর্থকদের হামলার ঘটনায়। যদিও অন্যান্য মামলায় দোষী সাব্যস্ত হয়ে কয়েক দশক কারাদণ্ডের মুখে রয়েছেন তিনি।

পিটিআইয়ের আইনজীবী উমাইর খান নিয়াজি শনিবার ইঙ্গিত দিয়েছেন, যা ঘটেছে তা ভুলে যেতে প্রস্তুত আছেন ইমরান খান। কেন্দ্র এবং পাঞ্জাব ও খাইবার পাখতুনখোয়ায় সরকার গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন দলটির প্রতিষ্ঠাতা।

নিয়াজি বলেছেন, নওয়াজ শরিফকে জোট সরকার গঠন করতে না দেওয়ার জন্য দেশটির ক্ষমতাশালীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন ইমরান। কারণ এর আগে এমন পরীক্ষা-নিরীক্ষা কাজে আসেনি। তিনি রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও দেশের ভবিষ্যতের জন্য এগিয়ে যেতে প্রস্তুত রয়েছেন।

সেনাপ্রধানের বক্তব্য ও পিটিআই আইনজীবীর বক্তব্যের পর পাকিস্তানের জটিল রাজনৈতিক অঙ্গনে আরেকটি সমঝোতার ইঙ্গিত একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

ইমরানের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী পিএমএল-এন ও পিপিপি উভয় দলকে দেশটিতে পারিবারিক দল হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই দুটি দলের নেতৃত্বে থাকা শরিফ ও ভুট্টো পরিবার কয়েক প্রজন্ম ধরে বিভিন্ন সময়ে দেশটি শাসন করেছে।

পাকিস্তানের সাবেক মন্ত্রী ও পিএমএল-এন’র সিনিয়র নেতা খুররাম দস্তগীর খান বলেছেন, আমরাই সরকার গঠন করবো। কিন্তু জোটের বিষয়টি এখনও সিদ্ধান্ত হয়নি।

পিএমএল-এন ও পিপিপি নিশ্চিত করেছে, পিটিআইয়ের সঙ্গে জোট গঠন নিয়ে তাদের কোনও আলোচনা হয়নি।

বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রেসিডেন্ট সরকার গঠনের জন্য বৃহত্তম দলকে আমন্ত্রণ বা জোট গঠন চূড়ান্ত হওয়ার আগে কয়েক দিন ধরে অর্থ বা সুবিধার বিনিময়ে পক্ষ ত্যাগের ঘটনা ঘটতে পারে।

পাকিস্তানে সেনাবাহিনীকে ক্ষমতার রাজনীতির মধ্যস্থতাকারী হিসেবে বিবেচনা করা হয়। গত কয়েক দশক ধরে নির্বাচনি ফলাফল নির্ধারণে তাদের ভূমিকা দেখা গেছে। তা ছাড়া চারটি অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তারা সরাসরি ক্ষমতা দখল করেছিল।

নির্বাচনের আগে স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল যে সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব ইমরান খানের ক্ষমতায় যাওয়া ঠেকাতে চায় যেকোনও মূল্যে। ২০১৮ সালে সেনাবাহিনীর সমর্থনেই জয়ী হয়েছিলেন তিনি। তার সরকারের ওপর সেনাবাহিনীর প্রভাবও ছিল। কিন্তু তাদের সম্পর্কে ফাটল ধরলে তার পতন পর্দার আড়াল থেকে নিশ্চিত করেন জেনারেলরা।

গহর আলী খান বলেছেন, স্টাব্লিশমেন্ট–সেনাবাহিনীকে ইঙ্গিত করতে ব্যবহৃত পরিভাষা– সবকিছুর নেপথ্য চালিকাশক্তি ছিল। তারা হয়তো সব কিছু নির্বাচনের আগে নির্ধারণ করে ফেলেছিল। কিন্তু আমার মনে হয় না তারা মানুষের কাছ থেকে আমাদের এমন সমর্থন আশা করেছিল। তিনি এখন ‘সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠান’কে জনগণের ম্যান্ডেট মেনে নেওয়ার সরাসরি আহ্বান জানিয়েছেন।

তিনি বলেছেন, স্টাব্লিশমেন্টকে রাজনীতির বাইরে থাকতে হবে, পিটিআই এই অবস্থানে অনড়। তারা অবশ্যই রাজনৈতিক অঙ্গনে হস্তক্ষেপ করবে না। তারা সরকার গঠন করবে না। এটি এখন বন্ধ করতে হবে।

তা সত্ত্বেও, নির্বাচনের ফলাফলে সামরিক বাহিনীর অদৃশ্য হাতকে ভূমিকা নিতে দেখা গেছে।

সেনাবাহিনীর নেতৃত্বের সঙ্গে পর্দার আড়ালে সমঝোতার ফলে রাজনৈতিক নির্বাসন থেকে দেশে ফিরে আসেন নওয়াজ শরিফ। কিন্তু সামরিক বাহিনীর সঙ্গে তার সম্পর্ক খুব ভালো না। অতীতে তিনবার ক্ষমতায় থাকার সময় যখনই তিনি সেনাবাহিনীর ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করতে গেছেন, তখনই উৎখাত হয়েছেন।

বিশ্লেষক ও পিএমএল-এন দলের সূত্র বলছে, নির্বাচনের ফলাফলের পর যে দুর্বল ও জোট সরকার ক্ষমতায় আসবে বলে মনে হচ্ছে, তারা সেনাবাহিনীর এজেন্ডা বাস্তবায়ন করবে। সেনাবাহিনীর রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক স্বার্থকে যাতে কেউ চ্যালেঞ্জ জানাতে না পারে তা নিশ্চিত হবে।

নওয়াজ ঘনিষ্ঠদের মতে, তিনি নির্বাচনের ফলকে বড় ধরনের বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে নিচ্ছেন। অনেকে মনে করছেন, যদি জোট অংশীদারদের সঙ্গে কোনও সমঝোতা হয় তাহলে হয়তো এর পরিবর্তে তার ছোট ভাই শাহবাজ শরিফ প্রধানমন্ত্রী হতে পারেন।

এক সিনিয়র পিএমএল-এন নেতা বলেছেন, আমি মনে করি পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে নওয়াজের ক্ষমতার আসার আকাঙ্ক্ষার কারণে সামরিক স্টাব্লিশমেন্ট সন্দিহান হয়ে পড়েছে। তারা আশঙ্কা করছে, পুরনো নওয়াজ আবার ফিরে আসতে পারেন। ফলে তাকে একটা শিক্ষা দিতে চেয়েছে তারা।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক নাঈম মালিকও প্রায় একই ধরনের মত তুলে ধরেছেন। তিনি বলেছেন, আমি মনে করি এই ফলাফলে সেনাবাহিনী সন্তুষ্ট। সমাজে যদি বিভক্তি ও মেরুকরণ থাকে তাহলে তাদের সুবিধা। তারা নিপীড়নের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করে। ফলে একটি ঝুলন্ত পার্লামেন্ট হলে সুবিধা হয় ক্ষমতার নিয়ন্ত্রকদের। রাজনৈতিক অঙ্গনে তাদের অবস্থান নিরাপদ ও বাধাহীন থাকে।

সূত্র: বিবিসি, দ্য গার্ডিয়ান, নিউ ইয়র্ক টাইমস, ডন

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

আরও পড়ুন:

Back to top button