বিশ্ব সংবাদ

নওয়াজ শরীফকেই ক্ষমতায় বসাবে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনি

কারাগারে থেকে পাকিস্তানের নির্বাচনে সেনাবাহিনীর কৌশল ভেস্তে দিতে পারেন ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান। তাকে বাইরে রেখে নির্বাচন করে ফেললেও ভোটের অঙ্কে পাকিস্তান মুসলিম লিগ-নওয়াজ (পিএমএলএন)-এর দান উল্টে যাওয়ার ইঙ্গিত মিলছে। যদিও গতকাল বৃহস্পতিবার দেশটির জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনের ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার সাত ঘণ্টা পরও কোনো আসনের ফল ঘোষণা করা হয়নি। কিন্তু ভোটকেন্দ্রগুলো থেকে পাওয়া খবর অনুযায়ী, অনেক আসনে ইমরানের দল তেহরিক-ই-ইনসাফ পাকিস্তান (পিটিআই) সমর্থিত প্রার্থীরা এগিয়ে আছেন।

গত রাতে আদিয়ালা কারাগার থেকে নেতাকর্মী-সমর্থকদের ভোটকেন্দ্র পাহারা দেওয়ার বার্তা পাঠিয়েছেন ইমরান। এর আগে তিনি কারাগার থেকেই পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোট দিয়েছেন। তার দলের আরেক নেতা শেখ আফজাল মারওয়াতও নেতাকর্মীদের ভোটকেন্দ্রের বাইরে জড়ো হওয়ার জন্য আহ্বান জানিয়েছেন। ভোটগণনা শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাদের সেখানে অবস্থান করতে বলেছেন। এর আগে পিএমএলএন ছাড়া সব দলই ভোট কারচুপির অভিযোগ করেছে।

স্থানীয় সময় গতরাত পৌনে ১১টা পর্যন্ত ৬১ শতাংশ ভোটকেন্দ্রে ভোটগণনা শেষ হয়েছে। তবে কোনো আসনে ফল ঘোষণা না করায় পিটিআই অভিযোগ করেছে, দলসমর্থিত প্রার্থীদের বিজয়ের সম্ভাবনা দেখেই ভোটগণনায় দেরি করা হচ্ছে। খবর পিটিভি, জিওনিউজ ও ডন নিউজ।

পাকিস্তানের নির্বাচনের আগের দিন গত বুধবার বালুচিস্তান প্রদেশে সন্ত্রাসী হামলায় ২৬ জন নিহত হওয়ার পর গতকাল জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে ভোটগ্রহণের দিন খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশে সহিংসতায় নিহত হয় আরও পাঁচজন। নির্বাচনী সহিংসতায় সারা দেশে নিরাপত্তা বাহিনীর ১০ সদস্যসহ ১২ জন নিহত হয়েছে বলে সেনাবাহিনীর তরফ থেকে জানানো হয়েছে।

পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানকে কারাগারে বন্দি রেখে সামরিক বাহিনী-প্রভাবিত নির্বাচন নিয়ে শুরু থেকেই বিতর্ক ছিল। সমালোচকরা বলছিলেন, পাকিস্তান মুসলিম লিগ-নওয়াজ (পিএমএলএন) দলের শীর্ষনেতা নওয়াজ শরিফকে আরও এক দফা ক্ষমতায় আনতে যাবতীয় পরিকল্পনা সাজিয়েছে সামরিক বাহিনী তথা এস্টাবলিশমেন্ট। পাকিস্তানের ‘নিয়ন্ত্রিত’ গণতন্ত্রের গুঞ্জন আরও চওড়া হয়, কারণ গতকাল সারা দিন ভোটগ্রহণের সময় সহিংসতা ঠেকানোর কৌশল হিসেবে ইন্টারনেট পরিষেবা ও মোবাইল ফোন সংযোগ সম্পূর্ণভাবে বন্ধ রাখা হয়।

কিন্তু ভোটগণনায় দান উল্টে যাওয়ার ইঙ্গিত মিলছে। ইসলামাবাদ, মুলতান, শিয়ালকোট ও রাওয়ালপিন্ডিতে জাতীয় পরিষদের অনেক আসনে ইমরানের পিটিআই-সমর্থিত প্রার্থীরা এগিয়ে থাকার খবর পাওয়া গেছে। পিটিআইয়ের ভাইস চেয়ারম্যান শাহ মোহাম্মদ কোরেশির মেয়ে মেহের বানু কোরেশি মুলতানের একটি আসনে ২৬ হাজারের বেশি ভোটে এগিয়ে আছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী পিএমএলএনের আবদুল গাফফার। পিটিআই নেতা ব্যারিস্টার আলি জাফর বিজয় দাবি করে বলেছেন, পিটিআই আগামী সরকার গঠন করবে।

গতকাল খাইবার পাখতুনখাওয়ার ডেরা ইসমাইল খান জেলার কুলাচি এলাকায় টহলরত পুলিশের একটি দলকে লক্ষ্য করে বোমার বিস্ফোরণ এবং গুলিবর্ষণে চার কর্মকর্তা নিহত হন। একই প্রদেশের সেই জায়গা থেকে ৩৫-৪০ কিলোমিটার দূরের একটি এলাকায় নিরাপত্তা বাহিনীর গাড়ি লক্ষ্য করে বন্দুকধারীদের হামলায় আরও এক ব্যক্তি নিহত হন। এদিন বালুচিস্তান প্রদেশের বিভিন্ন জায়গায় গ্রেনেড হামলার খবর পাওয়া যায়, তবে এতে হতাহত হয়নি কেউ।

ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে জাতীয় নির্বাচন আয়োজন করল পাকিস্তান। এতে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ১৭ হাজারেরও বেশি। এ নির্বাচনে ভোটার ১২ কোটি ৮০ লাখ। গতকাল ভোটগ্রহণ থেকে ভোটগণনা শুরু হওয়া পর্যন্ত সিন্ধু, পাঞ্জাবের বেশ কয়েকটি জায়গায় ছোটখাটো বিশৃঙ্খলার ঘটনা দেখা গেছে। পাল্টাপাল্টি অভিযোগ শোনা গেছে। তবে আন্তঃদলীয় কোনো বড় সংঘাতের খবর পাওয়া যায়নি। নির্বাচনের চূড়ান্ত ফল পেতে আজ শুক্রবার সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতে পারে।

এদিন কেন্দ্রীয় আইনসভার পাশাপাশি চারটি প্রদেশের আইনসভার নির্বাচনও হয়। ওইসব প্রাদেশিক পরিষদে একজন ভোটার দুটি করে ভোট দেন। পাকিস্তানের ফেডারেল সরকারব্যবস্থায় কেন্দ্রীয় আইনসভা ‘জাতীয় পরিষদ’ তথা ‘ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি’ যেখানে ২৬৬টি আসনে নির্বাচন হয়েছে। এসব আসনের মধ্যে পাঞ্জাবেই সবচেয়ে বেশি, ১৪১টি। সিন্ধু প্রদেশে ৬১টি, খাইবার পাখতুনখাওয়ায় ৪৫টি, বেলুচিস্তানে ১৬টি। এ ছাড়া রাজধানী ইসলামাবাদ অঞ্চলে রয়েছে ৩টি আসন। সরকার গঠন করতে প্রয়োজন ১৩৪টি আসন।

পাকিস্তানের জাতীয় নির্বাচনে সবসময় পাঞ্জাব প্রদেশের আধিপত্য দেখা যায়। অর্থাৎ সেখানে যারা ভালো ফল করে তারাই সরকার গঠনে মূল ভূমিকা নেয়। পিএমএলএন মূলত পাঞ্জাবভিত্তিক দল। আর সিন্ধু প্রদেশে প্রভাব রয়েছে ভুট্টো পরিবারের দল পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি)। এবার এই দুই দলের মধ্যেই হচ্ছে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা। তবে ইমরানের দল পিটিআই বলেছে, তাদের প্রার্থীরা চমকে দেবেন। এবারের নির্বাচনে এসব সমীকরণকে অনেকে পাত্তা দিচ্ছেন না। কারণ বিশ্লেষকরা মনে করছেন, পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী নওয়াজ শরিফকে আইনি ঝামেলা থেকে মুক্তি দিয়ে দেশে এনেছে এবং তাকে ক্ষমতায়ও বসাবে।

গতকাল পাঞ্জাবের লাহোরের একটি কেন্দ্রে ভোট দেওয়ার পর নিজ কন্যা ও দলের প্রধান সংগঠক মরিয়াম নওয়াজকে সঙ্গে নিয়ে গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেন তিনবারের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন ইসতেহকাম-ই-পাকিস্তান পার্টির (আইপিপি) নেতা আউন চৌধুরী। নির্বাচনের পর সরকার গঠন এবং তার সরকারের অগ্রাধিকার কী হবে এমন প্রশ্নের জবাবে নওয়াজ বলেন, ‘একটি দলকে অন্যের ওপর নির্ভর না করে স্বাধীনভাবে দেশ পরিচালনার জন্য সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে হবে। আল্লাহর দোহাই! জোট সরকারের কথা বলবেন না। একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।’

সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান নির্বাচন অনুষ্ঠানের দুই সপ্তাহ আগে থেকে ব্যাপক চাপের মুখে পড়েন। তার বিরুদ্ধে গোপন নথি ফাঁসের মামলায় ১০ বছর, তোশাখানা মামলায় ১৪ বছর এবং অনৈসলামিকভাবে বুশরা বিবিকে বিয়ে করায় ৭ বছর কারাদন্ডাদেশ পান ইমরান। এ ছাড়া ইমরান সরকারি পদগ্রহণে ১০ বছরের নিষেধাজ্ঞা পান তিনি। পাঞ্জাবের আদিয়ালা কারাগারে বন্দি থাকা অবস্থায়ই ইমরানের বিরুদ্ধে এসব মামলার বিচার চলে। নির্বাচনে তিনি অংশ নিতে পারেননি। তার দলের প্রতীক ‘ব্যাট’ ছিনিয়ে নেয় নির্বাচন কমিশন। তার দলের প্রার্থীরা স্বাধীন প্রার্থী হিসেবে নানা প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। ইমরান ও অন্যান্য কারাবন্দি নেতা আদিয়ালা কারাগার থেকে পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে তাদের ভোট দিয়েছেন। কিন্তু ইমরানের স্ত্রী বুশরা বিবি ভোট দিতে পারেননি, কারণ তাকে গ্রেপ্তারের আগেই পোস্টাল ভোটের প্রক্রিয়া শেষ হয়ে গিয়েছিল।

ইন্টারনেট ও মোবাইল ফোন সংযোগ বন্ধ করা নিয়ে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল জানিয়েছে, এ ধরনের পদক্ষেপ মানুষের অধিকারের ওপর দ্বিধাহীন আক্রমণ।

২০১৩ সালে নওয়াজ শরিফের দল ৮৯টি আসন নিয়ে সর্বোচ্চ আসন লাভকারী দল হয়। সেবার তিনি জোট সরকার গঠন করে প্রধানমন্ত্রীর আসনে বসেন। কিন্তু ২০১৭ সালে আদালত কর্তৃক আজীবন অযোগ্য হয়ে তিনি পদ ছাড়তে বাধ্য হন। একাধিক মামলায় সাজা ও আজীবন অযোগ্যতার খড়গ নিয়ে তিনি চিকিৎসার জন্য যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমান। নওয়াজ বেশ কয়েকবার অভিযোগ করেছিলেন, ওই সময়কার সেনাপ্রধান জেনারেল কামার জাবেদ বাজওয়া তাকে সরাতে ভূমিকা রাখেন। এর মধ্যে ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে ইমরান খানের দল সর্বোচ্চ আসন নিয়ে জয়লাভ করলে পিএমএলএন, পিপিপিসহ অন্যরা অভিযোগ করে, পিটিআই সেনাবাহিনীর পুতুল হয়ে ক্ষমতায় বসেছে। আর নেপথ্যে কাজ করেন জেনারেল বাজওয়া। কিন্তু ২০২২ সালের এপ্রিলে পাকিস্তান পিটিআইয়ের একাংশের বিদ্রোহের জেরে শেষ পর্যন্ত অনাস্থা ভোটে ক্ষমতা হারান ইমরান। পরে পিপিপি ও পিএমএলএন জোট সরকার গঠন করে। এ সময় ইমরান অভিযোগ করেন, তাকে সরাতে জেনারেল বাজওয়া ভূমিকা রেখেছেন।

ক্ষমতা হারানোর পর ইমরানকে শেহবাজ শরিফের সরকার একটি মামলায় গ্রেপ্তার করার পর গত বছর ৯ মে ব্যাপক সহিংসতা হয়। এ সময় আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু ছিল সেনাবাহিনীর স্থাপনা। রাজনৈতিক ভাষ্যকাররা বলেন, ইমরানকে বাইরে রাখার নীলনকশা করেছে সামরিক বাহিনী। আর নওয়াজকে নতুন আস্থাভাজন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইছে সেনাবাহিনী। তবে এসব পরিকল্পনাকে পাশ কাটিয়ে পিটিআই দাবি করছে, তারা নির্বাচনে বড় ইতিহাস সৃষ্টি করতে চলেছে। দলটি তার কর্মী-সমর্থকদের ভোটগণনা কেন্দ্র না ছাড়ার আহ্বান জানিয়েছে।

এসব বিতর্ক সত্ত্বেও প্রধান নির্বাচন কমিশনার সিকান্দার সুলতান রাজা গতকাল বলেন, এবার নির্বাচন প্রক্রিয়া ‘শতভাগ স্বচ্ছ ও শান্তিপূর্ণ’।

৫ মন্তব্য

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

আরও পড়ুন:

Back to top button