বিএনপিরাজনীতি

‘হতোদ্যম’ বিএনপির কর্মীরা, নেতারা বলছেন ‘আন্দোলন’

ঢাকা মহানগর বিএনপির কর্মী ইমরান আহমেদ বলেন, “এ পর্যন্ত চার বার কারাগারে গেছি, আমার বিরুদ্ধে মামলা ৩৫টা। কিন্তু মনের মধ্যে একটাই জিজ্ঞাসা, এই আন্দোলনের শেষ কবে?”

দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের পরে বিএনপির কর্মকৌশল নিয়ে দলের ভেতরে-বাইরে যেমন নানা মূল্যায়ন হচ্ছে, তেমনি রাজপথে আন্দোলনের ভবিষ্যৎ নিয়েও মাঠের নেতা-কর্মী-সমর্থকরা প্রশ্ন তুলেছেন, জানতে চাইছেন, এই আন্দোলনের শেষ কোথায়?

২০০৭ সালের নির্বাচন বাতিল হওয়ার পর জরুরি অবস্থা জারি, সেনা নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ক্ষমতা গ্রহণ, তিন মাসের বদলে সেই সরকারের প্রায় দুই বছর ক্ষমতায় থাকা এবং ছবিযুক্ত ভোটার তালিকা করে ২০০৮ সালের শেষে নির্বাচনের পর থেকেই ‘বেকায়দায়’ বিএনপি।

সেই নির্বাচনে জাতীয় পার্টি, জাসদ ওয়ার্কার্স পার্টি ও ছোট ছোট আরো কয়েকটি দলের সঙ্গে আওয়ামী লীগ জোট করে এবং জামায়াত, ইসলামী ঐক্যজোট ও জাতীয় পার্টি থেকে বের হয়ে গঠন হওয়া বিজেপির সঙ্গে বিএনপির জোটকে ধরাশায়ী করে ফেলে।

এরপর নির্বাচন হয়েছে আরো তিনটি। এর মধ্যে দুটি বর্জন করেছে বিএনপি, মাঝে ২০১৮ সালের নির্বাচনে গিয়ে ইতিহাসের সবচেয়ে খারাপ ফল করেছে।

দশম ও দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে আগে আন্দোলনে যাওয়া বিএনপির ঘোষণা ছিল নির্বাচন হতে না দেওয়ার। কিন্তু তেমনটি হয়নি; আর বিএনপির একাধিক শীর্ষ নেতা পরে বলেছেন, ২০১৪ সালের দশম সংসদ নির্বাচন বর্জনটাই ছিল ‘বড় ভুল’।

এবারের ভোটে যাওয়ার পরামর্শ খোলাখুলিই দিয়েছিলেন ভাইস চেয়ারম্যান হাফিজউদ্দিন আহমেদ। বিএনপি থেকে পদত্যাগ করে আরেক ভাইস চেয়ারম্যান শাহজাহান ওমর নৌকা নিয়ে ভোটে অংশ নেওয়ার পর বলেছেন, “আর কতবার নির্বাচনের বাইরে থাকব?”

কিন্তু বিএনপির ঘোষণা হল, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে কোনো নির্বাচনেই তারা আর যাবে না। সেই সিদ্ধান্তে এখনো তারা অটল। এবার যে স্থানীয় সরকার নির্বাচন হতে যাচ্ছে, তাতে সিটি করপোরেশন ও উপজেলায় ক্ষমতাসীন দল কাউকে দলীয় প্রতীক দেবে না জানানোর পরও বিএনপি অবস্থান পাল্টাচ্ছে না।

২০১৪ সালে বিএনপির ভোট বর্জনের পর আওয়ামী লীগ আরো দুই মেয়াদ পূর্ণ করেছে। বিএনপি নেতারা এখনও সরকার পতনের আশার কথা বলে যাচ্ছেন।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আবদুল মঈন খান বলেছেন, “কেন্দ্রে ভোটার আসেনি, শত প্রলোভনেও বিএনপি ভাঙেনি। এটা আমাদের আন্দোলনের সফলতা।”

দলটির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, “এই সরকারকে সরে যেতেই হবে। এটা দেশের সব মতের মানুষই বিশ্বাস করেন।”

‘নরম কর্মসূচি’, শীর্ষ নেতারা কারাগারে

ভোটের দুই দিন পরেই ‘যুগপৎ আন্দোলনের’ শরিকদের সঙ্গে বৈঠকে বসে বিএনপি। সেই বৈঠকের পর বলা হয়, ‘এক দফা’ দাবি থেকে সরছে না তারা।

সেই বৈঠকের তিন সপ্তাহের মাথায় নির্বাচন বাতিলসহ নানা দাবিতে দেশের সব জেলা ও মহানগরে দুই দিনের ‘কালো পতাকা মিছিল’ করে বিএনপি।

২৮ অক্টোবর আত্মগোপনে যাওয়া বিএনপির কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতার পাশাপাশি বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের এসব মিছিলে দেখা যায়।

নতুন সংসদ অধিবেশনে বসার দিন ৩০ জানুয়ারিও একই ধরনের কর্মসূচি রাখা হয়। তবে ঢাকায় পুলিশের বাধায় সেই কর্মসূচি পণ্ড হয়ে যায়।

ভোটের আগে বিএনপির সক্রিয় কর্মীদের মধ্যে যারা গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে গিয়েছিলেন, তাদের একটি বড় অংশ এখনো বন্দি।

বেশ কিছু মামলায় জামিন পেলেও প্রধান বিচারপতির বাসভবনে হামলা মামলায় জামিন না মেলায় মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী মুক্তি পাননি। গ্রেপ্তার অন্য শীর্ষ নেতারাও কোনো না কোনো মামলায় জামিন না পেয়ে আটকে আছেন।

অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে আরেক মামলায় স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য মির্জা আব্বাসের বিরুদ্ধে রায় ঘোষণার তারিখ ছিল ২৪ জানুয়ারি। তার আগের দিন নতুন করে যুক্তি-তর্কের সিদ্ধান্ত জানান বিচারক।

তবে ভোটের পরে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয় খুলেছে। ভোটের আগে আত্মগোপনে থাকা নেতাদের সেই কার্যালয়ে যাতায়াত বেড়েছে। তারা কর্মসূচিতেও যোগ দিচ্ছেন। নতুন করে গ্রেপ্তারের অভিযোগ এখন আর করছে না দলটি।

‘আরো পাঁচ বছর?’

প্রায় প্রতিদিনই ঢাকা ও ঢাকার বাইরে থেকে নেতা-কর্মীরা নয়া পল্টনে আসছেন, নেতাদেরকে বন্দি থাকা সহকর্মীদের ‘দুর্দশার’ কথা জানাচ্ছেন।

টাঙ্গাইলের মির্জাপুর থেকে আসা শহীদুল্লাহ চৌধুরী কারাগার থেকে বের হয়েছেন ভোটের পরে। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “আমার দুই বন্ধু এখনো কারাগারে। নেতাদের জানাতে পার্টি অফিসে এসেছি। হাড় কাঁপানো শীতে জেলে থাকাটা কত কষ্টের, আমি আপনাকে সেই অবস্থাটা বোঝাতে পারব না।”

বিএনপির আন্দোলনে কোনো একটি পরিকল্পনা কাজে না লাগলে বিকল্প পরিকল্পনা না থাকার বিষয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা যে বক্তব্য রেখেছেন, সেই সুরেই কথা বললেন শহীদুল্লাহ।

নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর এখন আর কর্মসূচি দিয়ে সুফল মিলবে কি না, সেই প্রশ্ন আছে তার মধ্যেও।

বিএনপি কর্মী শহীদুল্লাহ হতাশার সুরে বলেন, “আন্দোলন আমরা চালিয়ে যাব। কিন্তু এর শেষ কোথায় ভাই? আমাদের কর্মীরা বলে, ‘এভাবে কি আরও পাঁচ বছর?’ আমি জবাব খুঁজে পাই না।”

পুরান ঢাকার বাসিন্দা ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির কর্মী ইমরান আহমেদ বলেন, “দ্বিধা-দ্বন্দ্বে নেই, আন্দোলন করেই যাব। তবে একটা প্রশ্ন আমাদের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে, এভাবে আর কতদিন?

“ভেবেছিলাম সরকার নির্বাচন করতে পারবে না, দেখা গেল ‘একতরফাভাবে’ করে ফেলেছে। এরপর সরকারও গঠন করেছে। নেতারা বলছেন, রাজপথে আরও ত্যাগ স্বীকারের প্রস্তুতি নিতে হবে। আমরাও প্রস্তুত। এই পর্যন্ত চার বার কারাগারে গেছি, আমার বিরুদ্ধে মামলা ৩৫টা। কিন্তু মনের মধ্যে একটাই জিজ্ঞাসা, ‘এই আন্দোলনের শেষ কবে’?”

একটি বাণিজ্যিক ব্যাংকে কর্মরত বিএনপির সমর্থক সানজিদা খাতুন বলেন, “আন্দোলনের চুলচেড়া বিশ্লেষণ করে ‘দুর্বলতাগুলো’ চিহ্নিত করা উচিত। বিএনপি গত দেড় বছরে শান্তিপূর্ণ যে আন্দোলন করেছে, আমি এটাকে ইতিবাচকভাবে দেখি। এখন বিএনপির উচিত ‘ভুলগুলো’ চিহ্নিত করা, যেটা তারা করতে পারছে কি না, তা নিয়ে আমার সংশয় আছে।”

ফেনী থেকে আসা ছাত্রদল কর্মী রিফাত হাসনাইন মনে করেন, এখন কর্মসূচি দিয়ে ‘সুবিধা করা যাবে না’।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “সরকারের আমলাতন্ত্র, সামরিক ও বেসামরিক প্রশাসন, নির্বাচন কমিশন, বিচার বিভাগ যে অবস্থানে আছে, সেই অবস্থার পরিবর্তন যে আগামী পাঁচ বছর পরেও হবে, তারও কোনো পূর্বাভাস আমি দেখছি না।”

আন্দোলনের ‘সুফল মেলেনি’ আগেও

বিএনপি তাদের আন্দোলনে দৃশ্যত খালি হাতে ফিরেছে বেশ কয়েকবার।

২০১৪ সালের দশম সংসদ নির্বাচন ‘ঠেকানোর’ ঘোষণা ব্যর্থ হওয়ার এক বছর পর ২০১৫ সালের ৫ জানুয়ারি থেকে সরকার পতনের আগ পর্যন্ত অনির্দিষ্টকালের অবরোধ, পরে একই সঙ্গে হরতাল ও অবরোধ ব্যাপক সহিংসতা ও পেট্রোল বোমায় অগুনতি মানুষ ঝলসে যায়। কর্মসূচি এক পর্যায়ে ভেঙে পড়লে সেটি প্রত্যাহার না করেই ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে যায় বিএনপি।

২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে দুর্নীতি মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার রায় ঘোষণার আগে দেশে ‘আগুন জ্বালানোর’ হুমকি আসে। তবে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় পাঁচ বছরের সাজা নিয়ে বিএনপি নেত্রী যান কারাগারে। ওই বছরের অক্টোবরে হাই কোর্টে আপিলের রায়ে সাজা বেড়ে হয় দ্বিগুণ। জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় আসে আরো ৭ বছরের সাজার ঘোষণা।

চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলার রায়ের বিরুদ্ধে হাই কোর্টে এবং অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় আপিল বিভাগের শুনানিতে আর আগ্রহ দেখাচ্ছে না দল।

দুই বছর কারাভোগের পর প্রধানমন্ত্রীর নির্বাহী আদেশে দণ্ড স্থগিত হলে খালেদা জিয়া সাময়িক মুক্তি পেয়ে বাসায় ফেরেন। এরপর বিএনপি তাদের নেত্রীকে দেশের বাইরে পাঠানোর দাবিতে আন্দোলনে নামে একাধিকবার। একের পর এক কর্মসূচিতেও সায় আসেনি সরকারের তরফে।

খালেদা জিয়া কারাগারে যাওয়ার পর যুক্তরাজ্যে অবস্থানরত তার ছেলে তারেক রহমানকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান করা হয়। বিএনপি নেত্রী বাসায় ফেরার পরও দলের সিদ্ধান্ত দিচ্ছেন তারেকই। তবে তিনিও একাধিক মামলায় দণ্ডিত, তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি সাজা ঘোষণা হয়েছে ২০২৪ সালের ২১ অগাস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায়। যাবজ্জীবন সাজার বিরুদ্ধে তিনি আপিলও করতে পারেননি, কারণ আইনের দৃষ্টিতে তিনি পলাতক।

দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে পশ্চিমা বিভিন্ন দেশ, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান বিএনপির তৃণমূলের কর্মীদের আশাবাদী করেছিল। তবে কোনো দেশ বিএনপির দাবি অনুযায়ী তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে কথা বলেনি। আর বিএনপি ও সমমনাদের নির্বাচনের পর পশ্চিমারা এখন সরকারের সঙ্গে কাজ করে যাওয়া, এমনকি সম্পর্কোন্নয়নের ঘোষণাও দিচ্ছে।

বিরোধীদের বর্জনের মধ্যে নির্বাচন এর আগে জাতীয় পার্টিও করেছে, বিএনপিও করেছে। সেসব সরকার মেয়াদ পূর্ণ করতে না পারলেও ২০১৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকার প্রথমবারের মতো মেয়াদ শেষ করে আবার নির্বাচন দেয়।

বিএনপি ‘সফল’, দাবি নেতাদের

এবার ভোটের আগে বিএনপির নির্বাচনের কৌশল আগেরবারের চেয়ে আলাদা ছিল। ২০ দলীয় জোট ভেঙে দিয়ে যুগপৎ আন্দোলনে যায় তারা। জামায়াত জোটে থাকলে অন্যরা আসবে কি না, এ প্রশ্ন এরপর আর উঠেনি।

বিএনপির এই আন্দোলনে যুক্ত হয় ছোট ছোট কয়েকটি দলের মোর্চা গণতন্ত্র মঞ্চ, ২০ দলীয় জোটের সাবেক শরিকদের ১২ দলীয় জোট ও জাতীয়তাবাদী সমমনা জোট, গণতান্ত্রিক বাম ঐক্য, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি, লেবার পার্টি, এনডিএসহ ৩০টির বেশি ছোট ছোট দল।

শুরুতে অভিমানে দূরে থাকলেও ২৮ অক্টোবর থেকে বিএনপির সঙ্গে তাল মিলিয়েই কর্মসূচি দিয়েছে জামায়াতে ইসলামী। তবে রাজপথে তাদের উপস্থিতি ২০১৩ ও ২০১৫ সালের মত ছিল না।

ভোট শেষেও বিএনপির পক্ষ থেকে ঘোষণা আসে রাজপথে থাকার। নেতাদের ভাষ্য, আন্দোলন ছাড়া ‘বিকল্প পথ নেই’।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আব্দুল মঈন খান বলেন, “বিএনপির বড় সফলতা ভোট কেন্দ্রে ভোটাররা ‘যায়নি’। আপনারা যারা ৭ জানুয়ারি ঢাকায় ছিলেন তারা দেখেছেন, সড়ক-মহাসড়ক সব ফাঁকা, গাড়ি চলেনি, মানুষজনকে রাস্তায় দেখা যায়নি, ভোট কেন্দ্রগুলো ছিল প্রায় শূন্য, এটা তো একটা দিক।

“আরেকটা দিক হচ্ছে, এত মামলা, এত গ্রেপ্তার, এত চাপ, এত প্রলোভনের পরও বিএনপির নেতা, কর্মী, সমর্থকরা একাট্টা। এটাই বিএনপির সফলতা, এটাই বিএনপির অর্জন।”

বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী মনে করেন, তাদের কর্মসূচিতে সাফল্য আসবেই। সরকার পিছু হটতে বাধ্য হবে।

তিনি বলেন, “বিএনপি জনগণকে নিয়ে আন্দোলনে আছে। আন্দোলনের জনস্রোতই সরকার বিদায় ঘণ্টা বাজাবে। এটা আমাদের প্রতিটা নেতা-কর্মী-সমর্থক এবং ভিন্নমতের নাগরিকরাও বিশ্বাস করেন মনেপ্রাণে।”

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

আরও পড়ুন:

Back to top button