বিশ্ব সংবাদ

রাজনৈতিক দলগুলোতে ভারত-বিরোধিতা জোরদার হচ্ছে?

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর রাজনীতিতে আবার ভারত-বিরোধিতার ধারা প্রকট হচ্ছে। গত কয়েক বছরের তুলনায় এ নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে বেশি সরব হয়েছে দেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দল বিএনপি। ৭ জানুয়ারি নির্বাচনের পর বিএনপির এ অবস্থায় বেশ জোরালোভাবে প্রকাশ্যে এসেছে।

বিএনপি নেতাদের ভাষ্য, ভারতের একচেটিয়া সমর্থনে আওয়ামী লীগ টানা চতুর্থবার সরকার গঠন করেছে। ভারতকে বিএনপিও বন্ধু মনে করে, ভারতের জনগণের সঙ্গে বিএনপির কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু তাদের নীতি-নির্ধারকদের একচোখা আওয়ামীপ্রীতি থেকে থেকে সরে আসতে হবে। একটি দেশের সঙ্গে আরেকটি দেশের সম্পর্ক হওয়া উচিত। একটি দেশ কোনোভাবে আরেক দেশের নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলকে সমর্থন দিতে পারে না। কিন্তু ভারতের নীতি-নির্ধারকরা বছরের পর বছর এ কাজটি করে আসছেন। এ নিয়ে ভারতের জনগণকে সচেতন হতে হবে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলেছেন, ভারত নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোকে তাদের বক্তব্য পরিষ্কার করতে হবে, অন্যথায় ভারতের মানুষের কাছে ভুল তথ্য যাবে। রাজনৈতিক দলগুলো বলছে, বলতে থাকুক। কার বক্তব্য সঠিক, কার বক্তব্য সঠিক নয় তা জনগণ বিচার করবে।

সীমান্ত হত্যাসহ নির্বাচন নিয়ে ভারতের অবস্থান নিয়ে বিএনপির অভ্যন্তরে বেশ আলোচনা চলেছে। দলটির নেতারা বিভিন্ন আলোচনা সভা-সমাবেশে অংশ নিয়ে সীমান্ত হত্যাসহ ভারতের বিভিন্ন অন্যায় অবস্থানের বিরুদ্ধে বক্তব্য দিচ্ছেন।

আরও পড়ুন:

বাংলাদেশ ইস্যুতে ভারতের অবস্থানের প্রসঙ্গ টেনে ড. আবদুল মঈন খান বলেন, ‘বাংলাদেশের চেয়ে বন্ধু রাষ্ট্রের জনসংখ্যা প্রায় ১০ গুণ, আয়তন ২০ গুণ, সম্পদ ৫০ গুণ, সামরিক শক্তি ১০০ গুণেরও বেশি। তাহলে বাংলাদেশ নিয়ে তাদের সমস্যা কী? এত বড় একটি রাষ্ট্রের জন্য বাংলাদেশ নিরাপত্তা হুমকি হতে পারে? অসম্ভব। বিএনপি বারবার বলছে, আমরা স্বাধীনতার জন্য ৯ মাস মুক্তিযুদ্ধ করেছি, বুকের রক্ত ঢেলে দিয়েছি, দেশ স্বাধীন করেছি। আমাদের বন্ধু রাষ্ট্র সহায়তা না করলে হয়তো ৯ মাসের ব্যবধানে দেশ স্বাধীন করতে পারতাম না-এটা আমরা স্পষ্ট করে বলে থাকি।’

সোমবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে এক আলোচনায় অংশ নিয়ে বাংলাদেশের নির্বাচন ও সীমান্তে নিরীহ মানুষ হত্যায় ভারতের ভূমিকার কঠোর সমালোচনা করে তিনি এই মন্তব্য করেন।

ক্রিকেটের মতো খেলায় ভারত পরাজিত হলে বাংলাদেশের হাজারো মানুষ কেন উল্লাসিত হয় ভারতের নীতিনির্ধারকদের কাছে এই প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, ‘এই পরিস্থিতি কেন সৃষ্টি হয়েছে? এ দেশে একটি নির্বাচন হয়েছে। তার আগে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী কেন ভারতে গিয়ে বলেছেন, পরবর্তী নির্বাচনে জয়লাভে তাদের সহযোগিতা চান? এ বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশের মানুষ কথা বলেছে। বাংলাদেশের মানুষ কখনো মুখ বন্ধ করে থাকে না। পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে বলেছে, মুঘল সম্রাটরাও বাংলাদেশের মানুষের মুখ বন্ধ করতে পারেনি।’

ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের মতো আধুনিক বিশ্বে দ্বিতীয় কোনো সীমান্ত নেই যেখানে শত শত মানুষকে গত কয়েক বছরে গুলি করে মারা হয়েছে উল্লেখ করে মঈন খান বলেন, ‘আজকে আধুনিক বিশ্বে হিংসাত্মক রাজনীতির মৃত্যু ঘটেছে। আমরা জানি, পরাশক্তির দুটি বিভাজন আছে, যুদ্ধ হয়, যুদ্ধাবস্থার সৃষ্টি হয়, যেমন―ইউক্রেন ও গাজায় মানুষ মারা যাচ্ছে। কিন্তু আজকে যে দুটি বন্ধুত্বপূর্ণ দেশের সীমান্তে একটি দেশ নিরীহ মানুষকে গুলি করে মারে- এটি পৃথিবীর বর্তমান ইতিহাসে কোথাও নেই। আমরা সবার সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে বসবাস করতে চাই।’

জানতে ড. আব্দুল মঈন খান বলেন, ভারতের সঙ্গে আমাদের কোনো বিরোধিতা নেই। আমি খুব স্পষ্ট করেই বলেছি, সরকার পরিবর্তনের সাথে সাথে সরকারের সর্ম্পক থাকে না। কিন্তু মানুষের সাথে সম্পর্কটা থেকে যায়। সুতরাং আমাদের দুই দেশের মানুষের কথা চিন্তা করে কথা বলতে হবে।

এর আগে, গত শনিবার দুপুরে নয়াপল্টন কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে কালো পতাকা মিছিলে অংশ নিয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সভাপতি গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, ‘এই নির্বাচনে মাত্র সাত শতাংশ মানুষ ভোট দিয়েছে। বাংলাদেশের বাকি ৯৩ ভাগ মানুষ বিএনপির পক্ষে। সেটি এই নির্বাচনের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে।’

এদিকে, সোমবার নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘আওয়ামী লীগ সরকার বাংলাদেশের জনগণের ভোটের আশা করে না এবং বাংলাদেশের জনগণের ভোটের প্রতি আস্থা এবং বিশ্বাস নেই। ভারত সরকারের ক্ষমতার জোরে শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আছে। আওয়ামী লীগ এখন একটি ভারতীয় পণ্যে পরিণত হয়েছে। যা স্বাধীন, সার্বভৌম রাষ্ট্রের স্বার্থ ও মর্যাদার পরিপন্থী।’

তিনি বলেন, ভারত বাংলাদেশের জনগণ ও গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে অরাজক লুটেরা খুনি গণধিকৃত বাকশালী শাসনের পক্ষে সহযোগিতা করছে। বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় নেত্রী চারবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার বক্তব্য আজ অক্ষরে অক্ষরে প্রতিফলিত হচ্ছে। তিনি বার বার বলেছেন, শেখ হাসিনার ক্ষমতার উৎস জনগণ নয়। বিদেশী প্রভু। তারা দেশকে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের অঙ্গরাজ্য বানিয়েছে। বিদেশে আমাদের বন্ধু আছে, প্রভু নাই।

বিএনপির সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনে থাকা রাজনৈতিক দলগুলো ভারতকে নিয়ে শক্ত বক্তব্য দিচ্ছে। সোমবার সেগুনবাগিচায় দলীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, ভারত, চীন, রাশিয়া এই সরকারের প্রতি তাদের যে সমর্থন ব্যক্ত করেছে তা প্রধানত বাংলাদেশ কেন্দ্র করে তাদের ভূরাজনৈতিক স্বার্থের বিবেচনায়। ভারত এবারও স্থিতিশীলতার কথা বলে একটা ফ্যাসিবাদী সরকার ও তাদের পাতানো নির্বাচনী তামাশায় মদদ যোগাতে যেয়ে প্রকারান্তরে বাংলাদেশের জনগণের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার বিরুদ্ধেই অবস্থান নিয়েছে। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের গতকালের বক্তব্যে এটা প্রমাণ হয়েছে যে, ভারতের মদদ ও হস্তক্ষেপেই তারা ডামি নির্বাচন করতে পেরেছেন ও ক্ষমতায় টিকে আছেন।

তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ সরকার জবরদস্তি করে ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করতে গিয়ে বাংলাদেশকে পরাশক্তি সমুহের লীলাক্ষেত্রে পরিনত করছে। এই পরিস্থিতি এই অঞ্চলে অস্থিতিশীলতার ঝুঁকি ক্রমে বাড়িয়ে তুলছে।

এবি পার্টির সদস্য সচিব মজিবুর রহমান মন্জু বলেন, ‘এই অবৈধ সরকার প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের একতরফা পররাষ্ট্রনীতির সহোযোগিতায় টিকে আছে। ফলে বাংলাদেশের গণতন্ত্র, স্বাধীনতা এবং সার্বভৌমত্বকে হুমকির মুখে ফেলেছে।’

তিনি বলেন, ‘আমরা ভারতের গণতন্ত্রকামী মানুষকে বলতে চাই, আপনারা আপনাদের সরকারকে বলুন, তারা যেন গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের পক্ষে থাকে। স্বৈরতন্ত্রকে তারা যেন সমর্থন না দেয়।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ বলেন, ‘গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে ভারতের দায়িত্বও কিন্তু কম নয়। স্বাভাবিকভাবে নানা কারণে বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে একটা অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। অতি সম্প্রতি ভারত সীমান্তে হত্যার ঘটনা ঘটেছে। এটা বাংলাদেশের মানুষের স্মৃতিতে অনেককাল ধরে থাকবে।’

ভারত বিরোধিতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এটা নিয়ে এক শঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। মানুষ এটা যে যেভাবে দেখার দেখছে। তারা (রাজনৈতিক দলগুলো) বলছে বলুক, মানুষই এটা ঠিক করবে কার বক্তব্য সঠিক, কার বক্তব্য সঠিক নয়।’

জাহাঙ্গীর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কামরুল আহসান বলেন, ভারত হচ্ছে গণতান্ত্রিক বিশ্বের মধ্যে অন্যতম। বাংলাদেশের মানুষ রাষ্ট্র ভারতের বিরোধী নয়, বক্তব্যটা পরিষ্কার করতে হবে। এটা ‘রেজিম টু রেজিম’ বিরোধিতা। বাংলাদেশের অবৈধ ক্ষমতা দখল করা শেখ হাসিনা সরকারকে ভারতের জনগণের অধিকার হরণকারী মোদি সরকারের সমর্থনের বিরোধিতা করতে হবে।

তিনি বলেন, মোদি ভারতকে শেষ করছে। আর শেখ হাসিনা সরকার বাংলাদেশকে শেষ করছে। দুইয়ে মিলে উপমহাদেশের মানুষের সম্পৃক্তি ধ্বংস করছে। রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত এই বিষয়টি দুই দেশের মানুষের কাছে পরিষ্কার করে উপস্থাপন করা। এটা পরিষ্কার না করলে ভুল কূটনৈতিক বার্তা যাবে।

২ মন্তব্য

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

আরও পড়ুন:

Back to top button