এবার বিপিএলের জার্সিতে জুয়ার ওয়েবসাইটের বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ (বিপিএল)—এর নতুন ফ্র্যাঞ্চাইজি দুর্দান্ত ঢাকা—এর জার্সিতে দেখা যাচ্ছে একটি জুয়ার ওয়েবসাইটের সারোগেট বিজ্ঞাপন। শুক্রবার প্রথম ম্যাচে দুর্দান্ত ঢাকা হারিয়েছে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ানসকে। সেই ম্যাচে ঢাকার ক্রিকেটারদের জার্সিতে বুকে দেখা গেছে স্পন্সর ক্রিকনিউজ (KRIKnews) নামের একটি খেলার খবর সংক্রান্ত ওয়েবসাইটের বিজ্ঞাপন। একই রকম বানানে আছে একাধিক জুয়া বা বেটিং—এর ওয়েবসাইট যেখানে বিপিএল নিয়ে বাজি ধরাসহ অনলাইন ক্যাসিনো, স্লট গেমস টেবিল গেমসসহ অনেক রকম জুয়াতে অংশ নেওয়ার সুযোগ।

দুর্দান্ত ঢাকা এবারের বিপিএলে নতুন ফ্র্যাঞ্চাইজি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। দলটির মালিকানায় আছে নিউটেক্স গ্রুপ। দলটির অফিশিয়াল ফেসবুক পেইজে ১৮ জানুয়ারি সন্ধ্যা ৬—৪০ মিনিটে একটি পোস্টের মাধ্যমে জানানো হয়, ক্রিকনিউজ দুর্দান্ত ঢাকার ভ্যালুড স্পন্সর। সেই একই পোস্টে ক্রিকনিউজের ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, টেলিগ্রাম লিঙ্কসহ অনেক কিছু জানিয়ে দেওয়া হলেও ওয়েবসাইটের লিঙ্কই ছিল না! ওয়েবসাইটটিও সচল হয়েছে সম্প্রতি, জানুয়ারির ২০ তারিখের আগে এই সাইটে কোনো খবর প্রকাশিতও হয়নি।

একই বানানের একাধিক বেটিং ওয়েবসাইটের সন্ধান পাওয়া যায় অনলাইনে সার্চ করলেই। krikya.best, krikyabet.com, krikya777.com এরকম নামের অনেক ওয়েবসাইটই পাওয়া যায়, যেখানে ক্রিকনিউজ—এর মতো একই রকম লোগোও ব্যবহৃত হয়েছে। তবে জুয়ার ওয়েবসাইটে লোগোগুলো কমলা রঙের আর খবরের ওয়েবসাইটে এবং দুর্দান্ত ঢাকার জার্সিতে ব্যবহৃত লোগোটি সবুজ রঙের। বিপণনের ভাষায় এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় সারোগেট ব্র্যান্ডিং। ১৯৯৫ সালে ভারতের কেবল টিভি নেটওয়ার্ক অ্যাক্টের মাধ্যমে টেলিভিশনে অ্যালকোহলযুক্ত পানীয়ের বিজ্ঞাপন নিষিদ্ধ করা হয়। এরপর কিংফিশার—সহ অনেক অ্যালকোহলিক ব্র্যান্ডই একই লোগোযুক্ত বোতলজাত খনিজ পানি, ক্লাব সোডা কিংবা অন্যান্য পণ্যের বিজ্ঞাপন প্রচার করার মাধ্যমে সুপ্তভাবে নিজেদের মূল পণ্যের প্রচার করে আসছে। সাকিব আল হাসানও বেটউইনার নিউজ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর হয়ে সমালোচিত হয়েছিলেন, পরবর্তী সময়ে সাকিব চুক্তি বাতিল করতে বাধ্য হন।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে, যেখানে বেটিং বৈধ সেসব জায়গায় ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগগুলোতে নিয়মমাফিকই স্পনসর হচ্ছে বিভিন্ন বেটিং কোম্পানি। তবে বাংলাদেশের আইনে জুয়া অবৈধ। বিসিবি বিপিএলের জন্য যে ব্র্যান্ডিং গাইডলাইন দিয়েছে তাতে স্পষ্টই উল্লেখ করা আছে যে তামাক, অ্যালকোহল, বাজি এবং অনলাইন বাজি সংক্রান্ত সারোগেটেড এবং নন সারোগেটেড কোনো প্রতিষ্ঠান অংশ নিতে পারবে না। যদিও ১৮ জানুয়ারি মিরপুর স্টেডিয়ামে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপে বিপিএলের গভর্নিং কাউন্সিলের সদস্য সচিব ইসমাঈল হায়দার মল্লিক এক প্রশ্নের জবাবে জানিয়েছেন, ‘টি—টোয়েন্টি টুর্নামেন্ট কেন, বেশিরভাগ জাতীয় দলই তো এখন সারোগেট অ্যালাও করে দিয়েছে। দুই একটা ছাড়া সব জায়গায় আছে। ইন্ডিয়াতে আপনি দেখেন না, ড্রিম ইলেভেন থেকে শুরু করে অনেক প্রতিষ্ঠানই আছে। ভবিষ্যতে (বাংলাদেশে) হতেও পারে। লাস্ট ইয়ার বিপিএলে আমরা মিডিয়া রাইটস থেকে ১০ কোটি টাকা বেশি পেতে পারতাম। শুধু বেটিং সাইট না চালানোর জন্য আমাদের এই টাকাটা স্যাক্রিফাইস করতে হয়েছে।’

ঢাকার জার্সিতেই শুধু নয়, বিপিএলের সম্প্রচারেও সারোগেট বেটিং সাইটের বিজ্ঞাপন চোখে পড়ে। ওয়ানএক্সব্যাট, মেলব্যাট—সহ নানান প্রতিষ্ঠান ভিন্ন মোড়কে প্রচার করছে অনলাইন বেটিং—এর আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন। ক্রিকেট সংক্রান্ত খবর প্রচার করা ওয়েবসাইটগুলোতে ঢুঁ মারলেও জুয়ার হাতছানি এড়ানো যাবে না।

ক্রিকনিউজ—এর ওয়েবসাইটটি নিবন্ধিত আইসল্যান্ডের রেকিয়াভিকে। ক্রিকইয়া—এর নিবন্ধন কুরাকাওয়ে। বেটিং সাইটগুলো বন্ধ করার নানান প্রক্রিয়া বিটিআরসি অবলম্বন করলেও ইন্টারনেটের এই যুগে জুয়ার ওয়েবসাইটগুলো সামনে আসছে ভিন্ন ভিন্ন মোড়কে। ২০২২ সালের ২৮ ডিসেম্বর বিটিআরসি ৩৩১টি জুয়ার সাইট বন্ধ, ১৭টি ফেসবুক পেইজ ও ১৪টি অ্যাপস বন্ধ করলেও ঠেকানো যাচ্ছে না অনলাইন জুয়ার বিস্তার। ক্রিকইয়ার ওয়েবসাইটে বিপিএল, বিগব্যাশ সহ অনেক ক্রিকেট ম্যাচ নিয়েই বাজি ধরা যায়। কাল ফরচুন বরিশাল—রংপুর রাইডার্স ম্যাচে বরিশালের পক্ষে বাজির দর ছিল ১.৮৪ আর রংপুরের পক্ষে বাজির দর ছিল ১.৭৬। ক্রিকইয়ার ওয়েবসাইটে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী এখানে বিকাশ, নগদ, উপায়, ফাস্ট পে এসব মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস ব্যবহার করে বাংলাদেশি টাকায় বাজি ধরা যায়।

১৮ জানুয়ারি বিপিএল—এর সদস্য সচিব মল্লিকের বক্তব্য এবং পরের দিন অনলাইন বেটিং প্রতিষ্ঠানের সারোগেট ব্র্যান্ডের লোগো সংবলিত জার্সি গায়ে ঢাকা দলের মাঠে নামার ভেতর চাইলে যোগসূত্র খূঁজে পাওয়া যেতে পারে। দক্ষিণ আফ্রিকার এসএ টি—টোয়েন্টির টাইটেল স্পনসরই বেটওয়ে নামের একটি বেটিং কোম্পানি। অনেক দলেরই জার্সি স্পন্সর হচ্ছে বেটিং সাইটগুলোতে। নিয়মের ফাঁকফোকরের চোরাপথ দিয়ে তাই বাংলাদেশেও এই ধরনের প্রতিষ্ঠানগুলো জায়গা করে নিচ্ছে বিজ্ঞাপনের বাজারে।

Exit mobile version