বিএনপিরাজনীতি

উপজেলা নির্বাচনেও অংশ নেবে না বিএনপি ও বিএনপিপন্থিরা

বড় কোনো অঘটন ছাড়াই সম্পন্ন হয়েছে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। বিএনপিসহ বেশ কয়েকটি দলের বিরোধিতা সত্ত্বেও টানা চতুর্থবারের মতো সরকার গঠন করেছে আওয়ামী লীগ। নির্বাচনের আগে নানা মতভেদ থাকলেও একে একে নতুন সরকারকে অভিনন্দন জানাচ্ছে বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা। ফলে জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে সব রকম চাপ থেকে মুক্ত হয়ে এখন স্থানীয় সরকারের ভোটে নজর দিচ্ছে নির্বাচন কমিশন। সবার আগে উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের তফশিল ঘোষণার প্রস্তুতি নিচ্ছে তারা।

জানা গেছে, রোজার আগে মার্চের প্রথমার্ধেই প্রথম ধাপের নির্বাচন হতে পারে। এরই মধ্যে বিভিন্ন উপজেলায় সরব হতে শুরু করেছেন সরকারদলীয় সম্ভাব্য প্রার্থীরা। তবে জাতীয় নির্বাচনের মতো উপজেলা নির্বাচনেও বিএনপি অংশ নেবে না বলে জানিয়েছেন দলটির নীতিনির্ধারকরা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আসন্ন উপজেলা নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিষয়ে বিএনপিতে দুই ধরনের মত তৈরি হয়েছে। উপজেলা নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিষয়ে বিএনপির ভেতরে ভিন্নমত থাকলেও কঠোর কর্মসূচির বিপক্ষে প্রায় সবার অবস্থান এক। উপজেলা পরিষদ নির্বাচন নিয়ে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো আলোচনা করেনি বিএনপি। তবে দলীয় সরকারের অধীনে যে কোনো পর্যায়ের নির্বাচনে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত থাকায় নতুন করে আলোচনার প্রয়োজন নেই বলে দলের নেতারা মনে করেন। এর আগে গত উপজেলা পরিষদ নির্বাচনেও দলীয়ভাবে অংশ নেয়নি দলটি। স্বতন্ত্রভাবে কোনো কোনো নেতা নির্বাচনে অংশ নিলেও তাদের দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। দলীয় শৃঙ্খলা অটুট রাখতেই এ ধরনের কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিধা করেনি বিএনপির হাইকমান্ড। আসন্ন উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের ক্ষেত্রেও ভিন্ন কিছু হবে না।

এদিকে উপজেলা পরিষদ নির্বাচন নিয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটি এখন সংসদ নির্বাচন-পরবর্তী সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। সমমনা রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনে গেলে দলীয় ফোরামে আলোচনা-পর্যালোচনা করে নিজেদের করণীয় ঠিক করবে জামায়াত।

আরও পড়ুন:

তা ছাড়া স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নেবে না চরমোনাই পীরের দল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। এর আগে উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে উল্লেখযোগ্য ভোট পেয়ে সাড়া ফেলেছিল এই দল। তবে গত বছরের ১২ জুন বরিশাল সিটি নির্বাচনে ইসলামী আন্দোলন মনোনীত মেয়র প্রার্থী মুফতি সৈয়দ মুহাম্মাদ ফয়জুল করীমের ওপর দুবার হামলার ঘটনা ঘটে। এরপর সিলেট, খুলনা ও রাজশাহী সিটি করপোরেশন নির্বাচন বর্জন করে দলটি। সেই থেকে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে না যাওয়ার সিদ্ধান্তেই আছে ইসলামী আন্দোলন।

বিএনপি নেতারা জানান, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে নির্বাচনে না যাওয়ার সিদ্ধান্তে অনড় অবস্থানে রয়েছেন তারা। নির্দলীয় সরকারের দাবিতে আন্দোলনও অব্যাহত রয়েছে। এ অবস্থায় উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে অংশ নেওয়ার প্রশ্নই আসে না। তবে এবার দলের কেউ স্বতন্ত্রভাবে ভোট করতে চাইলে বাধা দেওয়া নাও হতে পারে। যদিও এ বিষয়ে দলের কোনো নেতা মন্তব্য করতে চাননি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত মঙ্গলবার বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির ভার্চুয়াল সভায় দলের সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক এবং সাম্প্রতিক বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। কিন্তু উপজেলা পরিষদ নির্বাচন নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি। দলটির কেন্দ্রীয় ও তৃণমূলের নেতাকর্মীরা বলছেন, সংসদ নির্বাচন বর্জন করে এখন উপজেলা নির্বাচনে যাওয়া ঠিক হবে না। কারণ, নির্বাচনে গেলে নেতাকর্মীদের ওপর নতুন করে হামলা-মামলা বাড়বে। এমনিতেই গতবছরের ২৮ অক্টোবরের মহাসমাবেশ ঘিরে গ্রেপ্তার করা হয়েছে অসংখ্য নেতাকর্মীকে। এখনো হাজার হাজার নেতাকর্মী ঠিকমতো বাসাবাড়িতে থাকতে পারেন না। গ্রেপ্তার অভিযান অব্যাহত রয়েছে। গ্রেপ্তারকৃত অধিকাংশ নেতাকর্মীই জামিন পাননি। তা ছাড়া, এই সরকারের অধীনে যে সুষ্ঠু নির্বাচন হয় না, তা বারবার প্রমাণিত। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তা ফের প্রমাণিত হয়েছে। ফলে নির্বাচনে গিয়ে যেমন জয়লাভের কোনো সম্ভাবনা নেই, তেমনি সংসদ নির্বাচন পুনরায় অনুষ্ঠানের যে দাবি তোলা হয়েছে তা দুর্বল হয়ে পড়বে।

জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান গতকাল বলেন, ‘আমরা কলঙ্কিত দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করেছি। দেশের মানুষও ওই নির্বাচন বর্জন করেছে। এখন উপজেলা নির্বাচন নিয়ে দলের নেতাকর্মীদের তেমন কোনো আগ্রহ নেই। এ বিষয়ে কোনো আলোচনা ও সিদ্ধান্ত হয়নি। সবকিছু পর্যবেক্ষণ করে দলের নীতিনির্ধারণী ফোরামে পরবর্তী চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে।’

বিএনপির কেন্দ্রীয় সহ-দপ্তর সম্পাদক তাইফুল ইসলাম টিপু বলেন, ‘কীসের উপজেলা নির্বাচন? আমরা তো দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন বর্জন করেছি। জাতীয় নির্বাচন করিনি। এখন উপজেলা নির্বাচনে গিয়ে অবৈধ সরকারকে বৈধতা দেওয়ার কোনো কারণ থাকতে পারে না।’

প্রসঙ্গত, আওয়ামী লীগ সরকারের পদত্যাগ, নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনসহ ১০ দফা দাবি আদায়ে ২০২২ সাল থেকে রাজপথে নামে বিএনপি ও সমমনা রাজনৈতিক দলগুলো। দলটি ২০২১ সালের মার্চের পর থেকে সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেনি। বরং দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নেওয়ায় তৃণমূলের অনেক নেতাকে দল থেকে বহিষ্কার করে বিএনপি। এর মধ্যে ২০২২ সালে বিএনপি নেতা তৈমূর আলম খন্দকার ও মনিরুল হক সাক্কু নারায়ণগঞ্জ ও কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলে দল থেকে তাদের বহিষ্কারের ঘটনা ছিল উল্লেখযোগ্য।

পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে জামায়াত:

গত ৭ জানুয়ারি দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সম্পন্ন হওয়ার পর দেশের সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। ভোটের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ দলটি অতীতে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয়ভাবে অংশ না নিলেও স্বতন্ত্রভাবে অনেকেই অংশ নিয়েছিলেন। উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদে অনেকেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জয়ী হয়েছিলেন। কিন্তু ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর স্থানীয় নির্বাচনে অংশ নেয়নি দলটি। তা ছাড়া সদ্য অনুষ্ঠিত দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের লক্ষ্যে দেশের বিভিন্ন আসনে প্রায় ১২০ জন সংসদ সদস্য প্রার্থীকে মনোনয়ন দিয়েছিল জামায়াত। তারা নানাভাবে গণসংযোগ ও প্রচারও চালিয়েছে। কিন্তু দলীয়ভাবে নির্বাচনে অংশ না নেওয়ায় স্বতন্ত্রভাবেও কোনো নেতা প্রার্থী হননি। এখন আসন্ন উপজেলা নির্বাচন নিয়েও দলটি কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি। বরং অন্য সমমনা রাজনৈতিক দলগুলোর মনোভাব দেখে এ বিষয়ে চিন্তাভাবনা করবে জামায়াত। জামায়াতের একাধিক নেতাকর্মীর সঙ্গে আলাপকালে জানা গেছে, তাদের অসংখ্য নেতাকর্মী এরই মধ্যে হামলা-মামলায় পর্যুদস্ত। এখন উপজেলা নির্বাচনে গিয়ে নতুনভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে চান না।

জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আব্দুল হালিম বলেন, ‘আমরা উপজেলা নির্বাচন নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিনি। সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। সবদিক বিবেচনায় দলীয় নীতিনির্ধারণী ফোরামে আলোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে।’

নির্বাচনে যাবে না ইসলামী আন্দোলন:

এদিকে আগামী মার্চে অনুষ্ঠেয় উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে অংশ নেবে না আরেকটি ইসলামপন্থি রাজনৈতিক দল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। সম্প্রতি দলটির আমির তথা চরমোনাই পীর মুফতি সৈয়দ মুহাম্মাদ রেজাউল করিমসহ কয়েকজন সিনিয়র নেতা ঘরোয়াভাবে আলোচনা করেছেন। ওই আলোচনায় উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে না যাওয়ার পক্ষে মনোভাব ব্যক্ত করেন নেতারা।

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রেসিডিয়াম সদস্য অধ্যাপক আশরাফ আলী আকন বলেন, ‘আমরা গত বছরের জুনে অনুষ্ঠিত সিটি নির্বাচন বর্জনের মাধ্যমে দলীয় সরকারের অধীনে সব ধরনের নির্বাচনে অংশগ্রহণ থেকে বিরত আছি। ভেবেছিলাম সরকার ও ইসির মনোভাবের পরিবর্তন হবে। কিন্তু যেই লাউ সেই কদু। এখন পুলিশ-প্রশাসন, নির্বাচন কমিশন সবই তো এক লীগ। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কীভাবে হয়েছে, তা তো দেশ-বিদেশের জনগণ প্রত্যক্ষ করেছেন। সুতরাং দলীয় সরকারের অধীনে আমরা কোনো নির্বাচনে যাব না, এটাই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত।’

দলটির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা গাজী আতাউর রহমান বলেন, ‘আমরা দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে না যাওয়ার সিদ্ধান্তে আছি। কারণ, বর্তমান সরকারের অধীনে নির্বাচনে গেলে কী হবে, সেটা অতীতের সিটি নির্বাচন এবং সম্প্রতি দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে পরিষ্কার হয়ে গেছে। তবে উপজেলা নির্বাচন নিয়ে নতুনভাবে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।’

ইসলামী আন্দোলনের নেতারা জানান, ১৯৮৭ সালের ১৩ মার্চ যাত্রা শুরুর পর থেকে ক্রমান্বয়ে সাংগঠনিক তৎপরতা বাড়িয়েছেন তারা। ২০১৭ সালে রংপুর সিটি নির্বাচনে ২৪ হাজার ভোট পেয়ে দলটি চমকে দেয়। সাম্প্রতিককালে দেশের আরও কয়েকটি স্থানীয় সরকার নির্বাচনে উল্লেখযোগ্য ভোট পেয়ে তারা আলোচনায় আসে। গত একাদশ জাতীয় নির্বাচনে দলটি ৩০০টি আসনেই প্রার্থী দিয়েছিল। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশগ্রহণসহ তৃণমূল পর্যায়ে সক্রিয়তার কারণে তাদের ভোট বাড়ছে। ২০১৬ সালে সারা দেশে চারটি ইউনিয়নে ইসলামী আন্দোলনের হাতপাখা প্রতীকের প্রার্থীরা বিজয়ী হন। ২০২২ সালে এসে ১৩ জন প্রার্থী হাতপাখা প্রতীকে ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান হিসেবে বিজয়ী হয়েছেন। অনেক এলাকায় দ্বিতীয় কিংবা তৃতীয় হয়েছেন ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থীরা। এ ছাড়া সিটি করপোরেশন কাউন্সিলর (ঢাকা দক্ষিণ) একজন, পৌরসভার কাউন্সিলর তিনজন এবং ইউপি সদস্য দুই শতাধিক রয়েছেন।

একটি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

আরও পড়ুন:

Back to top button