রমজানকেন্দ্রিক যেসব পণ্যের দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়লো

চাঁদ দেখা সাপেক্ষে আগামী মার্চের মাঝামাঝি সময়ে রমজান মাস শুরু হতে পারে। তবে দুই মাসের কম সময় বাকি থাকতেই রমজান-নির্ভর ৮ পণ্যের দাম হঠাৎ করে বেড়ে গেছে। ৭ই জানুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনের পরপরই বেশকিছু পণ্যের দাম বেড়ে গেছে রোজার পণ্য- ছোলা, ভোজ্য তেল, চিনি, পিয়াজ, মসুর ডাল ও খেজুর নিয়ে এবারও অসাধু চক্র কারসাজি করছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। আমদানি জটিলতার অজুহাত পুঁজি করেই চক্রটি এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। অবশ্য দেশের বাজারে রমজান নির্ভর পণ্যের সরবরাহ নিশ্চিত করতে ইতিমধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। তবে তা কার্যকর হচ্ছে না।

জানা গেছে, প্রতি বছর রমজানের আগেই নিত্যপণ্যের বাজারে এক ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং ভোক্তা স্বার্থ সংরক্ষণ অধিদপ্তর দফায় দফায় বৈঠক করে। এমনকি কিছু পণ্যের আমদানি শুল্কও কমানো হয়। কিন্তু ভোক্তারা এর সুফল পায় না। এবারো রোজায় বহুল ব্যবহৃত ৮ ধরনের পণ্য আমদানিতে এলসি মার্জিন শিথিল করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

এর আগে ডলার সংকটে অনেক পণ্যের আমদানিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক শতভাগ এলসি মার্জিন আরোপ করে। এছাড়া গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় নবনিযুক্ত মন্ত্রীদের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে রমজানে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ওদিকে বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী আহসানুল ইসলাম (টিটু) বলেছেন, পণ্যের মজুতদারির মাধ্যমে কেউ যাতে কৃত্রিম সংকট তৈরি করতে না পারে, সেজন্য আমরা ব্যবস্থা নিচ্ছি।
তথ্য বলছে, পাঁচ বছরের ব্যবধানে কোনো পণ্যের দাম বেড়েছে দ্বিগুণ, কোনোটি আবার তিনগুণ। ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ-এর (টিসিবি) হালনাগাদ তথ্য বলছে, প্যাকেট আটা কিনতে গুণতে হচ্ছে ৬৫ টাকা। অথচ বর্তমান সরকারের আগের মেয়াদের শুরুতে যে আটা পাওয়া যেতো ২৮ টাকা কেজিতে। একইভাবে ৯৫ টাকার সয়াবিন তেল কিনতে এখন গুনতে হচ্ছে ১৭০ টাকা। ডাল, পিয়াজ, আদা, রসুনের মতো অনেক পণ্য কিনতেই ভোক্তাদের পকেট থেকে দ্বিগুণ-তিনগুণ অর্থ বেরিয়ে যাচ্ছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, ডলার সংকটে সব স্থবির। এলসি জটিলতায় রমজান-নির্ভর পণ্য আমদানি করা যাচ্ছে না। এছাড়া জাহাজ ভাড়া ৫০-৬০ শতাংশ বেড়েছে। আগে প্রতিটন পণ্যে ৫০ ডলার ভাড়া ছিল, যা এখন ৭০-৭৫ ডলার হয়েছে।

বাংলাদেশ ফ্রেশ ফ্রুটস ইমপোর্টার্স এসোসিয়েশনের সভাপতি সিরাজুল ইসলাম বলেন, আমদানি করে খেজুর আনতে দুই মাস সময় লাগে। ডলার সংকটে পর্যাপ্ত এলসি খুলতে পারছি না। খেজুরের আমদানি শুল্ক কয়েকগুণ বাড়ানো হয়েছে বলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে। তবে এখনো কোনো সমাধান হয়নি। তাই দাম বাড়ছে।

রোজার পণ্যে বাড়তি মুনাফা করতে ছোলা, ভোজ্য তেল, চিনি, পিয়াজ, মসুর ডাল ও খেজুর নিয়ে এবারও অসাধু চক্র কারসাজি করছে।

এদিকে বাজারে কোনো ঘোষণা ছাড়াই প্রতি লিটার সয়াবিন তেলের দাম ৪ টাকা করে বাড়িয়ে দিয়েছে বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স এসোসিয়েশন। এর আগে ঘোষণা দিয়ে দাম বাড়ালেও এবারে চুপিসারেই দাম বাড়িয়েছে তারা। একইসঙ্গে প্রতি কেজি আটায় ৫ টাকা এবং ও চিনির দাম বেড়েছে ১৫ টাকা পর্যন্ত।

রাজধানীর বিভিন্ন খুচরা দোকান ঘুরে দেখা গেছে, প্রতি লিটার সয়াবিন তেল বিক্রি হচ্ছে ১৭৩ টাকায়। ৫ লিটারের বোতলের দাম ৮২৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৮৪৫ টাকায় বিক্রি করতে দেখা গেছে। দাম বাড়িয়ে ৫ লিটারের বোতল নির্বাচনের আগে বাজারে ছাড়লেও নতুন দামের এক লিটারের সয়াবিন তেল নির্বাচনের পরই বাজারে এসেছে।

ভোজ্যতেলের মধ্যে প্রতি লিটার খোলা সয়াবিন তেল নভেম্বরে বিক্রি হয়েছে ১৫০ টাকা। ডিসেম্বরে বিক্রি হয়েছে ১৫৫ টাকা, আর জানুয়ারিতে দাম বেড়ে ১৬০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। বোতলজাত সয়াবিন তেলের মধ্যে নভেম্বরে প্রতিলিটার বিক্রি হয়েছে ১৬৮ টাকা, ডিসেম্বর দাম বেড়ে ১৭০ টাকা ও জানুয়ারিতে বিক্রি হচ্ছে ১৭২ টাকা।

তেলের দাম বৃদ্ধির বিষয়ে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বলেছে, গত বছরের নভেম্বরে ডলারের দাম বেড়ে যায়। প্রতি ডলারের মূল্য ১১০ টাকা থেকে বেড়ে ১২২-১২৪ টাকা হয়ে যায়। এখন ঋণপত্র (এলসি) খোলার জন্য ডলার কিনতে হচ্ছে ১২৬-১২৭ টাকায়, যে কারণে তারা দাম বাড়াতে বাধ্য হয়েছেন।

মুদি দোকানি ফয়সাল বলেন, মনে হচ্ছে তেলের দাম আরও বাড়াতে পারে কোম্পানিগুলো। নির্বাচনের আগে ১৬৮ টাকা লিটারে সয়াবিন বিক্রি করেছি, এখন সেটা ১৭৩ টাকা। তারপরও ঠিকমতো সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে না। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, প্রতি বছর ২০ লাখ লিটার ভোজ্যতেল ও ২০ লাখ লিটার চিনির চাহিদা রয়েছে।

বাজারে দুই কেজির প্যাকেটের আটার দাম ১২০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৩০ টাকায় বিক্রি করতে দেখা গেছে। টিসিবি’র তথ্য বলছে, এক মাসের ব্যবধানে প্রতি কেজি আটার দাম ৪.৩৫ শতাংশ বেড়েছে। খুচরা বাজারে প্রতি কেজি ভালো মানের মসুর ডাল নভেম্বরে বিক্রি হয়েছে ১৩০ টাকা। ডিসেম্বরে বিক্রি হয়েছে ১৩৫ টাকা, আর জানুয়ারিতে বিক্রি হচ্ছে ১৪০ টাকা।

এদিকে ইফতারির আরেক আইটেম ছোলার দামও অনেক বেড়ে গেছে। প্রতি কেজি ছোলা নভেম্বরে বিক্রি হয়েছে ৮৫ টাকা। ডিসেম্বরে বিক্রি হয়েছে ৯০-৯৫ টাকা। জানুয়ারিতে বিক্রি হচ্ছে ৯৫-১০০ টাকা। ডলার সংকটের কারণে এলসি খুলতে পারছেন না ব্যবসায়ীরা। তাই কয়েক দিনের ব্যবধানে কেজি ২০-৩০ টাকা বেড়ে গেছে। বছরের ব্যবধানেও অনেক দাম বেড়ে গেছে। এফবিসিসিআই সূত্র বলছে, দেশে ছোলার চাহিদা প্রায় দেড় লাখ টন। আমদানি হয় প্রায় দুই লাখ টন। এর মধ্যে রমজান মাসে চাহিদা এক লাখ টন। কিন্তু আগেই বাড়ছে দাম। কাওরান বাজারের বিক্রয়কর্মী রায়হান জানান, সর্বশেষ পাইকারি পর্যায়ে কেজিতে ৩-৪ টাকা বেড়েছে। ভালোটা ১০০ টাকা কেজি। সেই ছোলা খুচরা বাজারে ১১০-১২০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, ডলারের দাম বেড়ে যাওয়ায় বাধ্য হয়েই তারা দাম বাড়িয়েছেন। এ ছাড়া লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচল সীমিত হয়ে পড়ায় পণ্য পরিবহনের সময় এবং খরচ বেড়ে গেছে, যার প্রভাবও বাজারের ওপর পড়ছে।

বাংলাদেশ ডাল ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি শফি মাহমুদ বলেন, ব্যাংক এলসি খুলছে না। তাই সরবরাহ কমে যাচ্ছে। দাম বাড়ছে। রমজান মাসে ডালেরও চাহিদা বাড়ে। সারা বছরে মসুর ডালের চাহিদা প্রায় ৬ লাখ টন। উৎপাদন হয় ২ লাখ টনের মতো। বাকি ৪ লাখ টন আমদানি করতে হয়। কিন্তু ডলার সংকটের কারণে আমদানি করা যাচ্ছে না।

চিনির দামেও অস্থিরতা। প্রতি কেজি প্যাকেট চিনি বাজারে ১৪৮ টাকা মূল্য থাকলেও বিক্রেতারা সেটা খুলে বাজারে বিক্রি করছেন ১৫৫-১৬০ টাকায়। বাজারে কোনো প্যাকেটের চিনি পাওয়া যাচ্ছে না। বাজার ঘুরে দেখা গেছে, ঢাকার বাজারে কোনো প্যাকেটের চিনি নেই। সব জায়গাতেই বিক্রি হচ্ছে খোলা চিনি। বেশি লাভের জন্য ১৪৮ টাকা মূল্যের চিনির প্যাকেট কেটে ১৫৫-১৬০ টাকায় বিক্রি করছেন দোকানিরা। খোলা চিনিও একই দামে বিক্রি হচ্ছে।

রাজধানীর বাংলামোটর এলাকার মুদি দোকানি মুসা বলেন, প্যাকেটের চিনির মোড়কের রেট ১৪৮ টাকা। কিন্তু এতে আমাদের ১ টাকার বেশি লাভ থাকে না এবং ক্রেতাও এর চেয়ে বেশি দাম দেবেন না। সে কারণে বাধ্য হয়েই প্যাকেট কেটে বিক্রি করতে হচ্ছে।

রমজান মাসে ইফতারির জন্য সবচেয়ে বেশি দরকার হয় খেজুরের। এটা সম্পূর্ণ আমদানি করতে হয়। খেজুরের বার্ষিক চাহিদা ৯০ হাজার টন থেকে ১ লাখ টন। এর মধ্যে রমজানে লাগে ৫০-৬০ হাজার টন। কিন্তু রমজান মাস আসার আগেই দাম অনেক বেড়ে গেছে। টিসিবি বলছে, গত বছর এই সময়ে ১৫০ থেকে ৪৫০ টাকা কেজি বিক্রি করা হলেও বর্তমানে ২৫০-৪৫০ টাকার কমে পাওয়া যাচ্ছে না। বাস্তবে বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে কেজিতে খেজুরের দাম ৩৫০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা। এ ছাড়া প্রতি কেজি তিউনিশিয়ার খেজুর নভেম্বরে ৩০০ টাকা বিক্রি হলেও ডিসেম্বরে বিক্রি হয় ৪০০ টাকা। আর সেই একই খেজুর জানুয়ারিতে বিক্রি হচ্ছে ৬০০ টাকা কেজি। এফবিসিসিআইয়ের তথ্যমতে, দেশে বার্ষিক চিনির চাহিদা ২০ লাখ টন। গড়ে মাসে দেড় লাখ টন লাগে। তবে রমজান মাসে লাগে ৩ লাখ টন।

এদিকে নভেম্বরে প্রতি কেজি পিয়াজ ১৩০ টাকা বিক্রি হলেও ডিসেম্বরে ১৩৫ টাকায় বিক্রি হয়। তবে দেশি জাত বাজারে আসায় দাম কিছুটা কমে ৯০-১১০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন মতে, গত অর্থবছরের জুলাই-নভেম্বরের তুলনায় চলতি অর্থবছরের একই সময়ে পিয়াজের এলসি বেড়েছে ১১২.৪০ শতাংশ ও আমদানি বেড়েছে ১০৫.৭৭ শতাংশ। একই সময়ের ব্যবধানে মসলা আমদানির এলসি খোলা বেড়েছে ৯২.৮২ শতাংশ ও আমদানি বেড়েছে ৮৯.৮৭ শতাংশ।

কনজুমারস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান বলেন, ব্যবসায়ীরা এখন রমজান আসার আগেই দাম বাড়িয়ে দেয়। কঠোর তদারকির মাধ্যমে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। তা না হলে এবারো রোজার মাসে ভোক্তার ওপর চাপ বাড়বে।

এদিকে গতকাল রমজান মাস সামনে রেখে যেসব মজুতদার নিত্যপণ্যের দাম বাড়ানো বা বাজারে পণ্যের কৃত্রিম সংকট তৈরির চেষ্টা করবেন সরকার তাদের ব্যাপারে কঠোর হতে একটুও পিছপা হবে না বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী আহসানুল ইসলাম টিটু।

জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক আব্দুল জব্বার মণ্ডল বলেন, অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে নিয়মিত বাজার তদারকি করা হচ্ছে। রমজান টার্গেট করে এখন থেকেই মনিটরিং জোরদার করা হচ্ছে। অনিয়ম পেলে কঠোর শাস্তির আওতায় আনা হবে।

Exit mobile version