বিএনপিরাজনীতি

যে ছকে চাঙ্গা হবে বিএনপির আন্দোলন

সরকারবিরোধী আন্দোলন আবারও চাঙ্গা করার পরিকল্পনা কষছে বিএনপি। এর অংশ হিসেবে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ অধিবেশনের প্রথম দিন আগামী ৩০ জানুয়ারি কর্মসূচি রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দলটি। এই কর্মসূচির মধ্য দিয়ে রাজপথের আন্দোলনকে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে চাইছে বিএনপি। তবে তার আগে কোনো কর্মসূচি পালন করা যায় কিনা তা নিয়েও আলোচনা চালিয়ে যাবে দলটি। গত মঙ্গলবার রাতে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির ভার্চুয়াল সভায় এই সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।

স্থায়ী কমিটির বৈঠক সূত্র জানায়, দ্বাদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে হরতাল-অবরোধ কিংবা সংসদ ভবন ঘেরাওয়ের মতো কর্মসূচি দেওয়া হতে পারে। নীতি নির্ধারকদের কেউ কেউ ওই দিন ঢাকায় সমাবেশ করারও প্রস্তাব দিয়েছেন। বৈঠকে ১৯ জানুয়ারি বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রয়াত জিয়াউর রহমানের ৮৯তম জন্মদিন উপলক্ষে আজ বৃহস্পতিবার থেকে দুই দিন কর্মসূচি পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, গতকাল বুধবার বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী কর্মসূচি ঘোষণা করেন। তিনি জানান, সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বীরউত্তমের ৮৯তম জন্মদিন উপলক্ষে বৃহস্পতিবার (আজ) বেলা ২টায় রমনায় ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে বিএনপির উদ্যোগে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে। পরের দিন শুক্রবার (কাল) দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়সহ দেশব্যাপী দলীয় কার্যালয়ে দলীয় পতাকা উত্তোলন, বেলা ১১টায় রাজধানী ঢাকার শেরেবাংলা নগরে জিয়াউর রহমানের কবর জিয়ারত ও পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হবে। এ দিন পত্রিকায় ক্রোড়পত্র প্রকাশ করা হবে। দলের অঙ্গ, সহযোগী ও পেশাজীবী সংগঠনগুলো সুবিধা অনুযায়ী, আলোচনা সভা ও শীতবস্ত্র বিতরণ করবে। সারা দেশে একই কর্মসূচি করবে বিএনপি এবং অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলো।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির নেতারা বলেন, জিয়াউর রহমানের জন্মদিনের কর্মসূচিই হতে পারে স্বাভাবিক রাজনৈতিক কার্যক্রম শুরুর প্রথম ধাপ। তারা মনে করেন, এর মাধ্যমে সারা দেশে নেতাকর্মীরা স্বাভাবিক কার্যক্রম করার সুযোগ পাবেন। ফলে এ দিনের কর্মসূচি ভালোভাবে পালন করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। দলের নেতারা মনে করছেন, জিয়ার জন্মদিনের কর্মসূচির মাধ্যমে বিপর্যস্ত রাজনৈতিক অবস্থা থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর পথ খুঁজে পাবে বিএনপি। জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খান বলেন, ‘আমাদের আন্দোলন চলমান রয়েছে। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় পর্যায়ক্রমে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি চলবে।’

সরকারের পদত্যাগসহ এক দফা দাবিতে আন্দোলনরত বিএনপি ও সমমনা রাজনৈতিক জোট ও দল ৭ জানুয়ারির ভোট বর্র্জনের ডাক দেয়। নির্বাচন কমিশন ফল ঘোষণা করলে ভোটের হার নিয়ে প্রশ্ন তুলে ‘কারচুপি’র মাধ্যমে আওয়ামী লীগ ফের ক্ষমতায় এসেছে বলে অভিযোগ করে আসছে বিএনপি। দলটি আগের একাদশ সংসদের মতো এই সংসদকেও ‘অবৈধ’ বলছে।

স্থায়ী কমিটির বৈঠক সূত্র জানায়, ৭ জানুয়ারি নির্বাচনের পর এখন পর্যন্ত কোনো কর্মসূচি না রাখলেও ধীরে ধীরে নিয়মতান্ত্রিক কর্মসূচিতে ফিরতে চায় বিএনপি। এ বিষয়ে স্থায়ী কমিটির নেতারা তাদের মতামত তুলে ধরেন। কেউ কেউ দ্রুত ঢাকায় সমাবেশ করার পরামর্শও দেন। তাদের মতে, সমাবেশের মাধ্যমে নেতাকর্মীরা আবার একত্র হওয়ার সুযোগ পাবেন। একই ধরনের মতামত দিয়েছে সমমনা দলগুলো। এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।

তবে দলের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের মতে, নেতাকর্মীদের সবাই এখনো আদালত থেকে জামিন পাননি। ফলে সমাবেশকে কেন্দ্র করে আবারও গ্রেপ্তার অভিযান শুরু হতে পারে। এ জন্য এখনই বড় ধরনের সমাবেশ না করে নেতাকর্মীদের জামিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে মতামত দেন কয়েক নেতা। সূত্র মতে, সরকারবিরোধী আন্দোলনে গতি আনতে চাইলেও এখনই জোরালো কর্মসূচিতে যাবে না বিএনপি। এখন জনসম্পৃক্ত কর্মসূচির কথাই ভাবছেন তারা। এ নিয়ে আজকালের মধ্যে আবারও শরিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করতে পারে দলটি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দলের একজন জ্যেষ্ঠ নেতা বলেন, স্বাভাবিক রাজনীতিতে ফেরার প্রক্রিয়া শুরু করার বিষয়ে দলের ভেতর আলোচনা শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে গুলশানে দলীয় চেয়ারপারসনের কার্যালয় এবং নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয় খোলা হয়েছে। আত্মগোপনে থাকা নেতাকর্মীরা প্রকাশ্যে আসতে শুরু করেছেন। আদালত থেকে নেতাকর্মীরাও জামিন পেতে শুরু করেছেন।

ধারাবাহিক বৈঠক অব্যাহত

দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান চলমান আন্দোলন চালিয়ে নিতে এবং দলের নেতাকর্মীদের মনোবল চাঙ্গা ও সাংগঠনিক শক্তি বাড়ানোর লক্ষ্যে করণীয় ঠিক করতে গতকাল বুধবারও দলের ভাইস চেয়ারম্যানদের সঙ্গে ভার্চুয়াল বৈঠক করেন। এর আগে অঙ্গ এবং সহযোগী সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান।

নির্বাচনের দুই দিন পর গত ৯ জানুয়ারি থেকে ৫ দিন টানা সমমনা রাজনৈতিক দল ও জোটের সঙ্গে বৈঠক করেন তারেক রহমান। গত মঙ্গলবার বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের পক্ষে দলের ছাত্র বিষয়ক সম্পাদক রফিকুল ইসলাম বকুল ও যুবদলের সভাপতি সুলতান সালাউদ্দিন টুকু ঢাকা মহানগর নেতাদের সঙ্গে ভার্চুয়াল বৈঠক করেন। এ ছাড়া ভোটের পর যুগপৎ আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত সমমনা দল ও জোট নেতাদের নিয়ে পাঁচ দিন বৈঠক করেন তারেক রহমান। পাশাপাশি অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনসহ তৃণমূল পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক করেন তিনি।

এ প্রসঙ্গে জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের মহাসচিব ও বিএনপির আইন বিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বলেন, ‘কারাবন্দি নেতাকর্মীদের মুক্তির বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। সারা দেশে জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকসহ জাতীয়তাবাদী আইনজীবী যারা আছেন, তাদের নির্দেশনা দেওয়ার আগেই তারা কাজ শুরু করেছেন। আইনি সহায়তা দেওয়া এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া, যা অব্যাহত আছে এবং থাকবে।’

গণতন্ত্র মঞ্চের শীর্ষ নেতা বিপ্লর্বী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, এখন আন্দোলনটা আরেকটু নতুনভাবে পুনর্বিন্যাস হবে। তার ধরন ও কৌশল নিয়ে আলোপ-আলোচনা হচ্ছে। আগামী সপ্তাহে বিএনপির সঙ্গে তাদের বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।

ভোটের অনিয়ম

গত মঙ্গলবার বিকালে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বিশেষজ্ঞ দলের সঙ্গে বৈঠক করেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির এক নেতা। গত সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউট (আইআরআই) ও ন্যাশনাল ডেমোক্র্যাটিক ইনস্টিটিউটের (এনডিআই) সঙ্গেও বৈঠক করেন বলে দলীয় সূত্রে জানা যায়। উভয় বৈঠকে, ৭ জানুয়ারির নির্বাচনের ভোটের হার ও অনিয়ম তুলে ধরা হয়।

উপজেলা নির্বাচন নিয়ে আলোচনা

রমজানের আগে উপজেলা পরিষদের প্রথম ধাপের নির্বাচন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশনের অতিরিক্ত সচিব অশোক কুমার দেবনাথ। এই নিয়ে বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে বিস্তর আলোচনা চলছে। এ বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য ও একজন ভাইস চেয়ারম্যান বলেন, এই সরকারের অধীনে নির্বাচনে যাওয়া সুযোগ নেই। তারপরও কেউ যদি যেতে চায় দলীয় প্রতীক ছাড়াই যেতে হবে। সে ক্ষেত্রে দল তাদের ব্যাপারে নমনীয় থাকবে; নাকি কঠোর হবে সেই সিদ্ধান্ত আলোচনা করেই নিতে হবে। তবে, কেউ কেউ শিথিলের পক্ষে বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

আরও পড়ুন:

Back to top button