দলীয় শৃঙ্খলায় কঠোর বিএনপি: নির্বাচনে যুক্ত হওয়ায় বহিষ্কার শতাধিক

ভোট ঠেকানোর মতো কঠোর অবস্থান থেকে সরে এলেও দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের যে কোনো কার্যক্রমে জড়িত হলে দলীয় নেতাকর্মীদের ছাড় দেবে না বিএনপি। বাস্তবতা বিবেচনায় মাঠের আন্দোলনে নমনীয় হলেও অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা রক্ষায় কঠোর অবস্থানে রয়েছে দলটি। বিভিন্ন নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা কিংবা বিভিন্ন প্রার্থীর হয়ে প্রচারে অংশ নেওয়ায় এরই মধ্যে বহিষ্কার হয়েছেন শতাধিক নেতা। যে কোনো নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে ৭ জানুয়ারি ভোট দেওয়াসহ নির্বাচনমুখী তৎপরতার প্রমাণ পেলে একই ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে বিএনপি নেতারা জানিয়েছেন। সরকারের পদত্যাগ ও নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের একদফা দাবিতে ধারাবাহিক আন্দোলন করছে বিএনপিসহ ৪২টি রাজনৈতিক দল। দাবি পূরণ না হওয়ায় বিএনপি ও তাদের মিত্ররা দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে অংশ না নিয়ে দফায় দফায় হরতাল-অবরোধ কর্মসূচি পালন করেছে। তবে শীর্ষ কয়েকজনসহ বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার ও বাকিরা আত্মগোপনে থাকায় এসব কর্মসূচি জনজীবন ও নির্বাচনী কর্মকাণ্ডে তেমন কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি। বরং মামলা ও গ্রেপ্তারের কারণে বিএনপি অনেকটাই কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় ‘নির্বাচন প্রতিহত’ করার মতো কঠোর অবস্থানে না গিয়ে দলটি ‘ভোট বর্জনে’ গুরুত্ব দিচ্ছে। সেই লক্ষ্যে সাধারণ মানুষকে ভোটকেন্দ্রে যেতে নিরুৎসাহিত করতে আজ শুক্রবার মিছিল-গণসংযোগ করবে বিএনপি ও যুগপতে থাকা অন্যান্য দল। আগামীকাল শনিবার সকাল থেকে টানা ৪৮ ঘণ্টার হরতাল কর্মসূচিও দেওয়া হয়েছে।

বিএনপি নেতারা বলছেন, ধরপাকড় এড়াতে বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী আত্মগোপনে চলে যাওয়ায় এর আগের হরতাল ও অবরোধ কর্মসূচিগুলো অনেকটা ঢিলেঢালাভাবে পালিত হয়েছে। পরিস্থিতি মূল্যায়ন করেই এখন ভোট বর্জনের প্রতি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সংঘাত-সংঘর্ষ এড়িয়ে মানুষকে ভোটকেন্দ্রবিমুখ করতে সর্বস্তরের নেতাকর্মীকে তৎপর থাকতে বলা হয়েছে। দলের নেতাকর্মীরা যাতে নির্বাচনী ডামাডোলে মিশে না যান, সে বিষয়ে সবাইকে সতর্ক করা হচ্ছে। এ বিষয়ে কেন্দ্র থেকে মনিটরিং করা হচ্ছে। দলের হাইকমান্ড ভোট বর্জনসহ শেষ পর্যায়ের কর্মসূচিকে অস্তিত্বের লড়াই হিসেবে বিবেচনা করছে।

কারও কারও মতে, এক বছরেরও বেশি সময় ধরে আন্দোলন করেও একদফা আদায় করতে পারেনি বিএনপি। তাদের বাইরে রেখেই জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। আন্দোলনে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জিত না হলেও সাংগঠনিক শৃঙ্খলার প্রতি গুরুত্ব দিচ্ছে দলটি।

বিএনপির নীতিনির্ধারকরা অবশ্য মনে করেন, এখন পর্যন্ত আন্দোলন সফল হয়েছে। দেশের মানুষ এই নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করেছে। ভোট নিয়ে উৎসব তো দূরের কথা, তাদের মধ্যে কোনো আগ্রহই নেই। সাধারণ ভোটাররা কেন্দ্রে না গেলেই আন্দোলনের চূড়ান্ত সাফল্য আসবে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান বলেন, ‘আমরা ভোটের রাজনীতিতে বিশ্বাস করি। কিন্তু নির্বাচন তো হয়ে গেছে। সুতরাং ৭ জানুয়ারি দ্বাদশ সংসদের ভোট কোনো গুরুত্ব বহন করে না। সরকারকে বুঝতে হবে এখন ২০২৪ সাল, ২০১৪ সাল নয়। ভুয়া-ধাপ্পাবাজির ভোট করে তারা আবারও পাঁচ বছরের জন্য ক্ষমতা নিশ্চিত করবে—এটা হবে না। আমরা রাজপথে থাকব; কিন্তু শান্তি ভঙ্গ করব না। এই সরকারকে হটিয়ে বাংলাদেশে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনব।’

এদিকে দলীয় সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে বিএনপির অনেক নেতা নির্বাচন প্রক্রিয়ায় যুক্ত হয়েছেন। বিভিন্ন দলে যোগ দিয়ে কিংবা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন বেশ কয়েকজন। এরই মধ্যে তাদের বহিষ্কার করেছে বিএনপি। এখন তৃণমূলের যেসব নেতাকর্মী কোনো দলের বা স্বতন্ত্র প্রার্থীর পক্ষে প্রচারসহ কোনোভাবে নির্বাচনী কর্মকাণ্ডে যুক্ত হলেই তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। বিএনপির নীতিনির্ধারক থেকে শুরু করে প্রতিটি স্তরের দায়িত্বশীল নেতারা এ বিষয়ে সারা দেশে নজর রাখছেন। নির্বাচন ইস্যুতে কেউ দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করলেই তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে দপ্তর সূত্রে জানা গেছে।

এ বিষয়ে ড. মঈন খান বলেন, ‘আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে বিএনপি প্রহসন ও ভাগ-বাটোয়ারার নির্বাচনে যাবে না, এটা দলীয় সিদ্ধান্ত। এই সিদ্ধান্ত অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়াটা যুক্তিযুক্ত।’

সংশ্লিষ্টরা জানান, গত এক সপ্তাহে অর্ধশতাধিক নেতাকর্মীকে দলের প্রাথমিক সদস্যসহ সব ধরনের পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। গত বুধবার পাঁচ জেলায় আটজনকে বহিষ্কার করা হয়। তারা হলেন বরগুনার আমতলী উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক জালাল ফকির, সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলা বিএনপির সহসভাপতি মো. আমানুল্লাহ আমান (মাস্টার), নাটোরের লালপুর থানা বিএনপির ২ নম্বর যুগ্ম আহ্বায়ক সিদ্দিক আলী মিষ্টু, মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সাবেক সহসভাপতি আবদাল হোসেন, চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলা বিএনপির সদস্য আবুল কালাম, জমির উদ্দিন, জাহাঙ্গীর আলম এবং চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা ছাত্রদলের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক এহেতাশামুল আজিম। ১ জানুয়ারি (সোমবার) বহিষ্কার করা হয় নীলফামারীর ডোমার উপজেলা বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি মোমিনুর রহমান, সিলেটের বিয়ানীবাজার উপজেলা বিএনপির সহসভাপতি কছির আলী, ঢাকা জেলা যুবদলের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক তানভীর আহমেদ সানু, দোহার থানা বিএনপির অর্থ সম্পাদক জাফর ইকবাল জাহিদ, ফরিদপুর সদরপুরের কৃষ্ণপুর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি মতিউর রহমান তালুকদার ও সাধারণ সম্পাদক ইউসুফ ব্যাপারীকে। গত মঙ্গলবার বহিষ্কার করা হয়েছে গাজীপুর সদর উপজেলা বিএনপির স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক শাহ আলম খলিফা এবং সদস্য রাজীব মাস্টারকে। এর আগে গত শনিবার এক দিনে সর্বোচ্চ ২৩ জনকে বহিষ্কার করে বিএনপি। সব মিলিয়ে গত ১৫ নভেম্বর নির্বাচনের তপশিল ঘোষণার পর থেকে এ পর্যন্ত শতাধিক নেতাকর্মীকে বহিষ্কারের পাশাপাশি কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে।

বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘যারা এই নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন বা প্রত্যক্ষ পরোক্ষ সহযোগিতা করছেন তাদের বলব, ন্যূনতম দেশপ্রেম ও বিবেক থাকলে ভোট বর্জন করুন। মীরজাফরের উত্তরসূরি হবেন না, ভোটকেন্দ্রে যাবেন না। ভাগবাটোয়ারার নির্বাচনে কেউ কোনো সহযোগিতা করবেন না। ভোটদান থেকে বিরত থাকুন। অন্যথায় জনগণ আপনাদের ক্ষমা করবে না।’

বিএনপিসহ বেশকিছু নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন বয়কট করলেও এবার সংসদের ৩০০ আসনেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা হচ্ছে। গুঞ্জন ছিল, বিএনপি নির্বাচনে না এলে দলটির উল্লেখযোগ্যসংখ্যক নেতা বিভিন্ন দলে যোগ দিয়ে বা স্বতন্ত্র প্রার্থী হবেন। শেষ পর্যন্ত নতুন নিবন্ধন পাওয়া একাধিক দলের ব্যানারে নির্বাচনী লড়াইয়ে শামিল হয়েছেন বিএনপির বেশ কয়েকজন নেতা। এ ছাড়া দলীয় অবস্থানের বাইরে গিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন কয়েকজন। ফলে নানা কারণেই স্থানীয়ভাবে ওই নেতাদের অনুসারী বা সমর্থকরা নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় যুক্ত হচ্ছেন। সেইসঙ্গে আত্মীয়তা, আঞ্চলিকতাসহ নানা রকম সম্পর্কের খাতিরে অন্য দলের প্রার্থীর নির্বাচনী প্রচারেও তৃণমূলের কেউ কেউ যুক্ত হচ্ছেন। এসব ক্ষেত্রে কাউকেই ন্যূনতম ছাড় দেওয়া হবে না বলে জানিয়েছেন বিএনপির দায়িত্বশীল নেতারা।

বিএনপির কেন্দ্রীয় সহদপ্তর সম্পাদক তাইফুল ইসলাম টিপু বলেন, ‘বিএনপি দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে না। সুতরাং বিএনপির কেউ নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় অংশ নিলে তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এটা চলমান প্রক্রিয়া।’

Exit mobile version