বাইকের টাকা জোগাড়ের জন্য শিশু অপহরণ, হত্যা

মানিকগঞ্জের সিংগাইর থানার বড়বাকা এলাকার উঠতি তরুণ হৃদয় হোসেন (২০) ও সাদ্দাম হোসেন (১৯)। এলাকায় তারা বখাটে হিসেবে পরিচিত। এই গ্রুপে ১৬ বছর বয়সী এক কিশোরও রয়েছে। দ্রুত অনেক টাকার মালিক হওয়ার চিন্তা ঢুকে তাদের মাথায়। এলাকায় প্রভাব খাটানোর জন্য তাদের মোটরসাইকেলও দরকার।

কিন্তু ধনী হতে এবং মোটরসাইকেল কেনার টাকা জোগাড়ে তাদের পরিকল্পনাটা ভালো ছিল না। এই কিশোর-তরুণেরা অপহরণ করে মুক্তিপণের টাকা দিয়ে বড় লোক হতে চেয়েছিল। সে অনুযায়ী এক শিশুকে অপহরণ করে মুক্তিপণও চায়। কিন্তু ধরা পড়ার ভয়ে শিশুটিকে খুন করে লাশ গুম করে।

স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের নজরে আসতে নিজেদের মোটরসাইকেল থাকা দরকার। এমন চিন্তা থেকে টাকার সন্ধান করতে থাকেন হৃদয় হোসেন, সাদ্দাম হোসেন ও নাজমুল হোসেন নামের তিন তরুণ।

পরিবারের সামর্থ্য না থাকায় তারা সিদ্ধান্ত নেন কাউকে জিম্মি করে মুক্তিপণের মাধ্যমে টাকা আদায় করবেন। আর ওই টাকা দিয়েই রাজনৈতিক নেতাদের দৃষ্টিতে আসতে মোটরসাইকেল কিনবেন তারা।

জিম্মি করার মতো লোক খুঁজতে থাকেন তারা। সেই সঙ্গে তিনজনই সিদ্ধান্ত নেন, অপহরণকৃত ব্যক্তিকে তুলে নেয়ার পর প্রথমে হত্যা করবেন এবং হত্যার শিকার ব্যক্তির পরনের পোশাক চিহ্ন হিসেবে রেখে দিয়ে মুক্তিপণ আদায় করবেন।

গত ২৮ আগস্ট সিংগাইরের বড়বাকা এলাকার নিজ বাড়ির সামনে থেকে অপহরণের শিকার হয়েছিল সাত বছরের শিশু আল আমিন। হত্যাকাণ্ডে জড়িত ওই তিনজনকে গত শুক্রবার পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) সদস্যরা গ্রেপ্তার করে। এরপর শিশু অপহরণ ও হত্যাকাণ্ডের চাঞ্চল্যকর তথ্য বের হয়। শনিবার রাজধানীর ধানমণ্ডিতে পিবিআই হেডকোয়ার্টারে ওই তিনজনকে গ্রেপ্তারের তথ্য জানিয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন পিবিআই কর্মকর্তারা।

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জাহাঙ্গীর আলম জানান, গত ২৮ আগস্ট সকাল ৯টার দিকে শিশু আল-আমিন মানিকগঞ্জে তার বাড়ির সামনে কাঁচা রাস্তার ওপর বাইসাইকেল চালানোর জন্য বের হয়। কিন্তু এক ঘণ্টা পার হলেও সে বাড়িতে ফিরে না আসায় তার মা খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। বাড়ির আশপাশ ও সম্ভাব্য সব জায়গায় খোঁজাখুঁজি করেও শিশুটিকে পাওয়া যায়নি। পরদিন তার বাবা শহিদুল ইসলাম সিংগাইর থানায় গিয়ে ছেলের নিখোঁজসংক্রান্ত জিডি করেন।

আসামি হৃদয় ওইদিন শিশুটিকে বন্যার পানি দেখানোর কথা বলে তুলে নেয়। তাকে স্থানীয় সাপের ভিটায় নিয়ে যাওয়া হলে সেখানে আগে থেকে অবস্থান নেয় তাদের গ্রুপের কিশোর সদস্য। এরপর ওই দুইজন আল আমিনকে শ্বাসরোধে হত্যা করে। এরপর প্লাস্টিকের একটি বস্তায় ভরে বাঁশঝাড়ের পাশে হাঁটু পানির নিচে সেটি লুকিয়ে রাখে। তবে আল আমিন যে তাদের কাছেই রয়েছে, তা প্রমাণে শিশুটির পরনের গেঞ্জি ও প্যান্ট নিজেদের কাছে রেখে দেয় তারা।

৩১ আগস্ট সকাল ১০টার দিকে প্রতিবেশীরা বেরুন্ডি গ্রামে টেমা মিয়ার পরিত্যক্ত ভিটায় একটি বাঁশঝাড়ের মাঝে শিশুর পরিহিত গেঞ্জির অংশ, প্যান্ট ও মাছির আনাগোনা দেখতে পান। সন্দেহ হওয়ায় বাঁশপাতা সরিয়ে মাটি খুঁড়ে একটি প্লাস্টিকের বস্তায় আলামিনের মৃতদেহ পান স্বজনরা।

পিবিআই কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর বলেন, তাদের পরিকল্পনা ছিল শিশুটিকে হত্যার পর নতুন সিম থেকে শিশুর স্বজনদেরকে ফোন দিয়ে মুক্তিপণ আদায় করবে। এজন্য আসামি সাদ্দামকে তা কিনতে দায়িত্ব দেওয়া হলেও সে ব্যর্থ হয়। মুক্তিপণ চাওয়ার আগেই স্থানীয়রা আল আমিনের লাশও পেয়ে যায়। এরপরই তিনজন এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যায়। তিনজনই ভারতে পালিয়ে যেতে বেনাপোল সীমান্তে চলে যায়। তবে তাদের কাছে প্রয়োজনীয় টাকা না থাকায় দালালদের মাধ্যমে পালাতে পারেনি। তা ছাড়া প্রযুক্তির সহায়তায় পিবিআই তাদের পিছু নিয়েছিল।

তিনি বলেন, ‘তারা পালানোর জন্য প্রথমে মানিকগঞ্জ থেকে সাভারের একটি হোটেলে ওঠেন। সেখানে হোটেল বয়ের ফোন থেকে ওই শিশুর বাবার কাছে ৩০ লাখ টাকা মুক্তিপণ চান হৃদয়, কিন্তু তারা ভয়ে ছিলেন যেকোনো সময় ধরা পড়বেন। তাই মুক্তিপণ চাইলেও তারা ওই দিন সাভার থেকে যশোরের বেনাপোল সীমান্তে চলে যান।

‘তারা চেয়েছিলেন সেখানে অবৈধভাবে ভারতে পালিয়ে যাবেন, কিন্তু নিরাপত্তা বাহিনীর কড়া নজরদারি এবং অবৈধভাবে প্রবেশের জন্য যাদের সহযোগিতা প্রয়োজন তাদের পর্যাপ্ত টাকা দিতে না পারায় তারা পালিয়ে ভারত যেতে ব্যর্থ হন। পরে সেখান থেকে তারা রাজবাড়ীতে পালিয়ে যান। সেখানে আত্মগোপনে থাকার চেষ্টা করলেও পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে গিয়ে পিবিআইয়ের জালে ধরা পড়েন।’

 

Exit mobile version