ইতিহাস-ঐতিহ্য

বাগদাদের আব্বাসি খিলাফতের পতন ও হালাকু খানের নির্মম গণহত্যা ও ধ্বংসজ্ঞ

শেষের দিকে আব্বাসি খলিফাগণ সামরিক বিভাগের প্রতি তেমন নজর দেয়নি।তারা তখন ভোগবিলাসে মত্ত ছিলেন। খলিফা মুসতানসির বিল্লাহ অবশ্য কিছুটা সচেতন হয়েছিলেন। তাতারদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে তিনি ১ লাখ সেনার একটি বাহিনী গঠন করেন; কিন্তু তার মৃত্যুর পর খলিফা মুসতাসিম বিল্লাহ তার উজির আলকামির পরামর্শে এই বাহিনী ছোট করে ফেলেন। তিনি শুধু ১০ হাজার সেনা রাখেন। আলকামি ছিলেন শিয়া। তার সঙ্গে হালাকু খানের নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। তার পরামর্শে হালাকু খান বাগদাদ আক্রমণ করে বসেন।

বাগদাদ আক্রমণ (১২৫৮ খ্র:) মোঙ্গলদের নিকট গুপ্তঘাতক সম্প্রদায় নিশ্চিহ্ন হইলে সুন্নি মুসলমানগণ স্বস্তির নিশ্বাস ফেলিল। বোধকরি, ইহাতে তাহাদের যথেষ্ট উল্লাসেরও কারণ ছিল। কিন্তু অচিরেই এই উল্লাস মহাশোকের কালো ছায়া ডাকিয়া আনিল। কারণ হালাকু খান গুপ্তঘাতক সম্প্রদায়কে শায়েস্তা করিবার পর আব্বাসীয় খিলাফতের রাজধানী বাগদাদ আক্রমণের জন্য অগ্রসর হইলেন। এই সময় বাগদাদের খলিফা ছিলেন আল-মুসতাসিম বিল্লাহ্ (১২৪২-৫৮ খ্রি:)। বাগদাদ আক্রমণের জন্য হালাকু খানকে অজুহাত খুঁজিয়া বাহির করিতে বিশেষ বেগ পাইতে হইল না।

গুপ্তঘাতক সম্প্রদায়কে দমন করিবার জন্য হালাকু খান ইতোপূর্বে বাগাদের খলিফার সহযোগিতা কামন করিয়াছিলেন। কিন্তু খলিফা হালাকু খানের এই আহ্বানে কর্ণপাত করেন নাই। ইহাতে ক্রোধান্বিত হইয়া হালাকু খান বাগদাদ অভিমুখে ধাবিত হইলেন এবং অবিলম্বে তাহার নিকট খলিফাকে আত্মসমর্পণ করিবার দাবি জানাইলেন। খলিফার নিকট লিখিত একটি পত্রে হালাকু খান তাঁহাকে এই মর্মে অভিযুক্ত করিলেন যে গুপ্তঘাতক সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে তাঁহাকে সহযোগিতা না করায় তিনি স্বীয় কর্তব্যের প্রতি অবহেলা দেখাইয়াছেন এবং সেই কারণে সুন্নি মুসলমানদের খলিফা পদের

অযোগ্য বলিয়া প্রতিপন্ন হইয়াছেন। খলিফা হালাকু খানের এই দাবিকে ঘৃণাভরে উড়াইয়া দিলেন এবং পরিষদবর্গের পরামর্শক্রমে হালাকু খানের এই পত্রের এক কড়া উত্তর পাঠাইলেন। ফলে হালাকু খানের সহিত খলিফার সংঘর্ষ অনিবার্য হইয়া দাঁড়াইল।৬৫৬ হিজরির ১২ মুহররম, ১২৫৮ খ্রিষ্টাব্দের ১৯ জানুয়ারি তাতাররা বাগদাদ অবরোধ করে। শহরের নিয়মিত বাহিনী আগেই কমিয়ে আনা হয়েছে, শহরবাসীও কখনো জিহাদের কথা চিন্তা করেনি, ফলে পুরো শহরে নেমে আসে আতঙ্ক আর হতাশা। খলিফা তখনো নাচ-গানে ব্যস্ত ছিলেন। আরাফা নামে তার এক প্রিয় দাসী নৃত্য করছিল তার সামনে।

তাতারদের ছোট একটি দল চলে আসে প্রাসাদের কাছাকাছি। তাদের নিক্ষিপ্ত তিরের আঘতে খলিফার সামনেই মারা যায় তার প্রিয় দাসী আরাফা।

১২৫৮ খ্রিস্টাব্দের জানুয়ারি মাসে হালাকু খান বাগদাদ নগরী অবরোধ করিলেন। খলিফা বাগদাদ রক্ষা করিবার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করিয়াও ব্যর্থ হইলেন।৷ অতঃপর ৪০ দিন বাগদাদ নগরী অবরোধ করিয়া বৃহৎ প্রস্তরখণ্ড (Catapult) এবং জ্বলন্ত অগ্নির (Naptha) সাহায্যে প্রাচ্যের সুরম্য নগরী বাগদাদের প্রাচীর বিশ্বস্ত করেন।খলিফা এবার জান বাঁচাতে পরামর্শ চান আলকামির কাছে। আলকামি বললেন, ‘চলুন হালাকু খানের কাছে যাওয়া যাক। তার সঙ্গে কথা বলে আমরা নিরাপত্তা নিয়ে আসব।’ খলিফা মেনে নিলেন আলকামির কথা। খলিফা ৭০০ জনের এক বিশাল বহর নিয়ে রওনা হলেন শহরের বাইরে হালাকু খানের সঙ্গে দেখা করতে। এই দলে ছিলেন আলিম, ফকিহ, সুফি, সাহিত্যিকসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ।

ভীত ও সন্ত্রস্ত সর্বশেষ খলিফা মুসতাসিম নিষ্ঠুর হালাকু খানের নিকট আত্মসমর্পণ করিয়া প্রাণভিক্ষা চান। হালাকু খান প্রথমেই খলিফাকে তার সাথিদের কাছ থেকে আলাদা করে ফেলেন। তারপর তাদের সকলকে হত্যা করে খলিফাকে বন্দি করলেন। পরদিন খলিফাকেও হত্যা করা হয়। তাঁহার পরিবারের সকলকে হত্যা করা হয়। উল্লেখযোগ্য যে, হালাকু খান খলিফাকে রাসূলে করীমের বংশধর মনে করিয়া ঘাতে নিহত করিতে ইতস্তত করেন এবং একটি কার্পেটে তাহাকে জড়াইয়া শ্বাসরুদ্ধ করিয়া হত্যা করেন। হালাকুর পত্নী ডকুজ (Doquz) এবং শিয়া সম্প্রদায়ভুক্ত উপদেষ্টা নাসির উদ্দীন তুসীর পরামর্শ অনুযায়ী খ্রিস্টান এবং শিয়া সম্প্রদায়ের লোক ব্যতীত প্রায় ১৬ লক্ষ লোককে মাত্র ছয় সপ্তাহে হত্যা করা হয়। হালাকুর “নিষ্ঠুর ও রত্ন-লোলুপ বর্বর হালাকু রাসুলের উত্তরাধিকারীকে হত্যা করিতে ইতঃস্তত করেন।

মোঙ্গল বাগদাদের সমৃদ্ধি বিলুপ্ত হয়, সুন্নী ইসলামের পরিবর্তে মোঙ্গল ইলখানদের প্রভুত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়
মোঙ্গল বাগদাদের সমৃদ্ধি বিলুপ্ত হয়, সুন্নী ইসলামের পরিবর্তে মোঙ্গল ইলখানদের প্রভুত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়

কারণ তাহার সৈন্যবাহিনীর যে সমস্ত মুসলিম সৈনারা বাগদাদ অভিযান করে তাহারা তাহাকে সাবধান করিয়া দেয় যে, যদি বলিফার রক্ত মাটিতে পড়ে তাহা হইলে সমস্ত পৃথিবী তমসাচ্ছন্ন হইবে এবং মোগল বাহিনী৷ ইসলামের ইতিহাস ও মোঙ্গল বাহিনী নগরে প্রবেশ করিয়া এক সপ্তাহব্যাপী লুন্ঠন, নরহত্যা ও পাশবিক অত্যাচারের তাণ্ডবলীলা চালাইল। ইবনে খলদুনের মতে প্রায় ষোল লক্ষ লোক এই মর্মান্তিক হত্যাকান্ডে প্রাণ হারাইয়াছিল। ঐতিহাসিক আমীর আলী এই ধ্বংসলীলার এক লোমহর্ষক বর্ণনা লিপিবদ্ধ করিয়াছেন। খলিফা আল-মুসতাসিম জীবন রক্ষার্থে তাহার সঞ্চিত সকল ধনরত্ন লইয়া হালাকু খানের নিকট আত্মসমর্পণ করিলেন। কিন্তু ইহাতেও তাহার প্রাণ রক্ষা পাইল না।

খলিফা হত্যা করিবার ভয়াবহ পরিণতি সম্মন্ধে হালাকু খানকে সতর্ক করিয়া দেওয়া হইল যে, “যদি খলিফাকে হত্যা করা হয় তবে বিশ্বব্রহ্মান্ডে চরম বিশৃঙ্খলা শুরু হবেই, সূর্য উদিত হইবে না, অনাবৃষ্টি দেখা দিবে এবং মাটিতে আর ফসল ফলিবে না।” কিন্তু হালাকু খান ইহাতে বিন্দুমাত্র বিচলিত হইলেন না। খলিফা এবং তাহার পরিবারবর্গের প্রায় সকলকেই নির্মমভাবে হত্যা করা হইল। কেবল কিছুসংখ্যক চাটুকার, শিল্পী ও অমুসলমান নাগরিক ব্যতীত বাকি সকলেই মোঙ্গলদের হাতে নিষ্ঠুরভাবে প্রাণ হারাইল। আর সেই সঙ্গে ইসলামী শিক্ষা ও সভ্যতার প্রাণকেন্দ্র এবং ‘প্রতীচ্যের রোম’ বলিয়া আখ্যায়িত বাগদাদ নগরী মোঙ্গলদের হাতে সম্পূর্ণরূপে বিধ্বস্ত হইল। বাগদাদের সমৃদ্ধ সব পাঠাগার ধ্বংস করা হয়।

বইপত্র ফেলে দেওয়া হয় দজলা নদীতে। বইয়ের পাতা থেকে কালি উঠে নদীর পানি কালো হয়ে যায়।সমৃদ্ধ এই শহরের অলিগলি হয়ে উঠে নির্জন। পথে পথে পড়ে থাকে অর্ধগলিত মৃতদেহ। রাতারাতি ভূতুড়ে শহরে পরিণত হয় বাগদাদ।

৪০ বছর আগে খলিফা নাসির লি দিনিল্লাহ বাগদাদে বসে যে শত্রুকে আমন্ত্রণ করেছিলেন খাওয়ারিজম আক্রমণ করার জন্য, ৪০ বছর পর সেই শত্রুই আক্রমণ করে বসে বাগদাদে। পতন ঘটে আব্বাসি খিলাফতের। ইতিহাসের এ এক নির্মম ট্রাজেডি।

**ফলাফলঃ হালাকু খান কর্তৃক বাগদাদ অধিকারের ফলে পাঁচশত বৎসরের পুরাতন ও ঐতিহ্যবাহী আব্বাসীয় বংশের পতন ঘটিল এবং বাগদাদ পারস্যের ইল্-খানি সাম্রাজ্যের অধীনস্ত একটি প্রাদেশিক শহরে পরিণত হইল। সভ্যতা ও সাংস্কৃতিক দিক হইতে বাগদাদের পতন আরও বেদনাদায়ক। কারণ বাগদাদ ছিল তৎকালীন মুসলিমবিশ্বের শিক্ষা ও সভ্যতার প্রাণকেন্দ্র। এই ধ্বংসলীলায় অসংখ্য গ্রন্থাগার ভস্মীভূত হয় এবং বহু প্রখ্যাত মনীষী ও বৈজ্ঞানিক প্রাণ হারান। বাগদাদ নগরী স্থাপত্য শিল্পের জন্য বিখ্যাত ছিল। কিন্তু মোঙ্গল আক্রমণের ফলে এই নগরীর বহু মসজিদ, রাজপ্রাসাদ ও সুরম্য অট্টালিকা বিধ্বস্ত হয় এবং নগরীটি এক মহাশ্মশানে পরিণত হয়। এই ধ্বংসের ফলে শুধু যে মুসলিমবিশ্বের অপূরণীয় ক্ষতি হইয়াছিল তাহাই নহে বরং গোটা বিশ্ব সভ্যতার সামগ্রিক অগ্রগতিও বিশেষভাবে ব্যাহত হইয়াছিল। হালাকু খানের বাগদাদ আক্রমণ ও লুণ্ঠন আব্বাসীয় খিলাফতের পতনের সর্বশেষ এবং প্রধান কারণ ছিল।

**ঐতিহাসিকগণের মতামত : গিলমান বলেন, “এইরূপে শত-সহস্র নিহতদের প্রকট গগনভেদী আর্তনাদ এবং বর্বর বিষয়ে মোঙ্গলদের প্রকট উন্মাদনায় যে বাগদাদ পাঁচশত বৎসর ধরিয়া শিল্প, বিজ্ঞান এবং সাহিত্যের গৌরবোজ্জ্বল কেন্দ্রে হইয়াছিল তাহা চিরতরে বিলুপ্ত হইল।”

অনেকের মতে মুসতানসিরের শিয়া নির্যাতন এইরূপ চরম আকার ধারণ করে যে, শিয়া মন্ত্রী মুহম্মদ বিন আল-কামী ঈর্ষান্বিত হইয়া হালাকু খানকে বাগদাদ আক্রমণের আমন্ত্রণ জানান। আবদুল লতিফের মতে, “মোঙ্গলদের প্রলয়ঙ্করী – রক্তপিপাসু অভিযান এইরূপ একটি দুর্যোগ যাহা অপরাপর দুর্যোগকে ম্লান করিয়া দিয়াছে।” আব্বাসীয় খিলাফতের অধঃপতনে সুন্নী-মুসলিম সমাজ ধর্মীয় এবং রাষ্ট্রীয় প্রতীক হারাইয়া দিকভ্রান্ত হইয়া পড়ে। ইবন আসিরের মতে, “তাতারদের আক্রমণ সাধারণভাবে সমগ্র বিশ্বের উপর বিশেষভাবে মুসলমানদের উপর আপতিত দৈবদুর্বিপাকগুলির অন্যতম। পরবর্তী যুগে এইরূপ দুর্ঘটনা সংঘটিত হয় নাই।” বার্নার্ড লুইস বলেন, “কয়েকটি দিক হতে  ইহাকে যতটুকু আঘাত বলিয়া মনে করা হয় ঠিক ততটা ছিল না। খলিফাগণ বহু দিন পূর্বেই প্রকৃত ক্ষমতা হারান।

সুলতানগণ রাজধানীতে ও প্রদেশসমূহে প্রকৃত ক্ষমতাধিকারী ছিলেন; তাহারা (সুলতানগণ) খলিফাদের ধর্মীয় সুবিধাগুলি পর্যন্ত অন্যায়পূর্বক ভোগ করিতে থাকেন। মুদ্রায় নামাঙ্কন, খুৎবায় নাম পাঠ প্রভৃতি ক্ষেত্রে মোঙ্গলগণ একটি মৃত প্রতিষ্ঠানেরই (খিলাফত) ভূতকে ধ্বংস করে।” এই প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য যে, বর্বর হালাকুর নিধনযজ্ঞ এবং ধ্বংসলীলা নিজামিয়া এবং মুসতানসারিয়া মাদ্রাসা রক্ষা পায়। ১৩৪৩ খ্রিস্টাব্দে তৈমুরলঙ্গের বাগদাদ আক্রমণের দুই বৎসর দুইটি প্রতিষ্ঠান সংযুক্ত করা হয় এবং ১৩২৭ খ্রিস্টাব্দে ইবন বতুতা ইহা পর্যবেক্ষণ করেন। যাহা হউক, মোঙ্গল বাগদাদের সমৃদ্ধি বিলুপ্ত হয়, সুন্নী ইসলামের পরিবর্তে মোঙ্গল ইলখানদের প্রভুত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। আমীর আলী “শিক্ষার আগার, সভ্যতার ক্ষেত্র এবং সারাসিন জগতের চক্ষু ও কেন্দ্রভূমি বাগদাদ চিরতরে ধ্বংসপ্রাপ্ত হইল।”

গ্রন্থ :
মধ্যযুগের মুসলিম ইতিহাস, প্রফেসর আশরাফউদ্দিন আহমেদ।
সুলতান জালালুদ্দিন খাওয়ারিজম শাহ, ইসমাইল রেহান।
ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি, প্রফেসর সৈয়দ মাহমুদুল হাসান।

বাংলা ম্যাগাজিন /এসপি

Flowers in Chaniaগুগল নিউজ-এ বাংলা ম্যাগাজিনের সর্বশেষ খবর পেতে ফলো করুন।ক্লিক করুন এখানে


বাংলা ম্যাগাজিন ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন



Back to top button